গবেষণা-নিবন্ধ

জীবনচিত্র : কাঁদো নদী কাঁদো

ড. মোহাম্মদ তাজুদ্দিন আহম্মেদ

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ (১৯২২-১৯৭১) ‘অন্য জাতের, সামনে আছে যতখানি, পেছনে তার বহুগুণ। তিনি তাঁর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অভিজ্ঞতার কথা বলেন, বলেন পরোক্ষে, পটভূমি যার বিশাল সমাজ ও সময়। তাঁর তৃতীয় ও শেষ উপন্যাস ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ (১৯৬৮) নির্মাণ করেছেন চেতনাপ্রবাহ রীতিতে। ঔপন্যাসিক এই পদ্ধতিতে ব্যক্তির জীবনের ভেতরের, বাইরের পাপ-পূণ্য, প্রেম-ঘৃণা, বিদ্বেষ-প্রতিহিংসা ও লৌকিক সংস্কারসহ নানা বিষয়ের উপস্থাপন করেছেন গভীর দার্শনিক দৃষ্টিতে। উপন্যাসটির আলোচনা প্রসঙ্গে একজন সমালোচক বলেছেন :

‘কাঁদো নদী কাঁদো’ উপন্যাসটির কাহিনীতে রয়েছে দুটি ধারা, যা প্রবাহিত হয়েছে উপন্যাসের শেষ পর্যন্ত। একটি মুহাম্মদ মুস্তফার জীবনালেখ্য, অন্যটি বাকাল নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় নদীতে স্টীমার চলাচল বন্ধ হলে তার তীরবর্তী জনমানুষের জীবনে নেমে আসা দুর্দশার কথা। মুহম্মদ মুস্তফার চাচাত ভাইয়ের অন্তর্লোকে দৃশ্যমান ঘটনাস্রোতই হচ্ছে মুহাম্মদ মুস্তফার জীবনের কথামালা, আর তবারক ভুঁইঞার সংলাপের মাধ্যমে উপস্থাপিত কাহিনী কুমুরডাঙ্গার গল্প।

অতীত স্মৃতিচারণের মাধ্যমে ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ উপন্যাসের কাহিনী ক্রমে অগ্রসরমান। চেতনাপ্রবাহ রীতির এই প্রবাহমানতা প্রধানত শ্রুতি ও স্মৃতির অনুষঙ্গবাহী। তা দু’জন কথকের মাধ্যমে উপস্থাপিত। একজন প্রধান কথক, সে উপন্যাসের কাহিনী উত্তম পুরুষে উপস্থাপন করেছে। তাকে কথক-১ এবং তবারক ভূঁইয়া যে কাহিনীর অধিকাংশ বর্ণনা করেছে তাকে কথক-২ বলে আলোচনার সুবিধার্থে চিহ্নিত করা যায়। স্টীমার যাত্রী তবারক ভুঁইঞা বা কথক-২- এর বর্ণনা করা কুমুরডাঙ্গার কাহিনী আধোঘুম আধোজাগরণে শুনতে পায় কথক ‘আমি’ বা কথক-১। সে-ও স্টীমারের অন্য একজন যাত্রী। কথক-২ বা তবারক ভুঁইঞার কণ্ঠে শোনা কাহিনী কথক ‘আমি’ বা কথক-১-এর চেতনায় জাগিয়ে তোলে তার চাচাত ভাই মুহাম্মদ মুস্তফার জীবন-ইতিহাস : মুহাম্মদ মুস্তফার শিশুকাল, বাল্যজীবন, শিক্ষাজীবন, চাকরিজীবন এবং তার ফুফাতো বোন খোদেজার প্রসঙ্গসমূহ। তবারক ভুঁইঞার জবানীতে উপস্থাপিত কুমুরডাঙ্গার উপাখ্যানের ভিত্তিও স্মৃতি। তবারক ভুঁইঞার অতীত স্মৃতিচারণে উপস্থাপিত হয়েছে বাকাল নদীর কথা। নদীটির তলদেশ ভরাট হয়ে মৃতপ্রায় হলে, নদীটির জন্যে শোকাচ্ছন্ন হয়ে ওঠে তার তীরবাসী মানুষেরা। তাদের হতাশা, দুর্দশার কাহিনী অবশেষে একাকার হয়ে গেছে মুহাম্মদ মুস্তফার বিপর্যস্ত জীবনের কথায় ও পরিণতিতে। ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ উপন্যাসে ব্যক্তির মনোজাগতিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি জনগোষ্ঠীর মানসলোকের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াকেও মূর্ত করে তোলা হয়েছে।’ ফলে, ‘মানবপ্রেম, মৃত্তিকাপ্রেম ও মানসিক আস্থার মাঝ দিয়েই ঘটেছে কুমুরডাঙ্গার ভয় ও শঙ্কামুক্তি।’ মুহাম্মদ মুস্তফার চাচাত ভাইয়ের মাধ্যমে উপন্যাসে উপস্থাপিত হয়েছে মুহাম্মদ মুস্তফার নিজের গ্রাম ও সেখানকার মানুষের জীবনচিত্র। অন্যদিকে গঞ্জ-শহর কুমুরডাঙ্গা ও সেখানকার মানুষের জীবনচিত্র উপস্থাপিত হয়েছে তবারক ভুঁইঞার মাধ্যমে। ‘এর ভাঁজে ভাঁজে রয়েছে একটি জনপদের ইতিহাস, অতিপ্রাকৃত বিশ্বাস এবং রহস্য ও অন্ধকারাচ্ছন্নতা। এ উপন্যাসের কাহিনী, ঘটনা ও চরিত্র-চিত্রণ সকল যৌক্তিকতাই নির্ভর করেছে এই পরিমন্ডলটির উপর। এবং তা এই বাংলাদেশের …‘যেখানে অমাবস্যা গ্রাস করে চাঁদকে, কবর শাসন করে জীবনকে, নদী যায় শুকিয়ে, যেখানে মানুষ কাঁদে, অভিশপ্ত জীবনের অভিশাপ বহন করে চলে, শীর্ণ নদীটির মত।’ ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ উপন্যাসে উপস্থাপিত জনপদ এবং মানুষের জীবনের কথামালা উপন্যাসের ‘আমি’ বা কথক-১ ও কথক-২ বা তবারক ভুঁইঞার স্মৃতি-অনুষঙ্গের দুটি ধারার বিবরণে হয়েছে বাণীবদ্ধ, তা ‘যুক্তবেণীর মত বুনোটবদ্ধ’। এদের মাধ্যমেই উপন্যাসের কাহিনী, ‘আলো-আঁধারির মধ্যে প্রবেশ করে, যে আলো-আঁধারির রহস্য ‘কাঁদো নদী কাঁদো’র ফর্মে একটি বিশিষ্ট মাত্রা হিসেবে বিরাজ করছে।’ বাংলাদেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ, চিরচেনা মানুষ ও সামাজিক পটভূমিতে’ সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র উপন্যাস রচিত। সে সময়ের ‘সমাজ-জীবনে যে এক ধরনের বন্ধ্যাত্ব বিরাজ করেছিল তার কারণ অর্থনৈতিক।’ আর্থিক সঙ্কটে শতছিন্ন সে সমাজের মানুষের জীবনচিত্র এ উপন্যাসের কাহিনী। উপন্যাসটির কাহিনী শুরু হয়েছে এভাবে  স্টীমার প্রশস্ত নদী ছেড়ে সংকীর্ণ নদীতে প্রবেশে করে এগিয়ে চলে সামনের দিকে। শেষ বিকেলের ম্লান আলোয় জাহাজের ডেকে বসে গল্প-কথার আসর। গল্প বলা লোকটি হরতনপুর গ্রামের মকসুদ জোলার কথা বলছিল। অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, বন্যায় ফসল নষ্ট হয়েছিল তার জমির। আগুনে পুড়েছিল তার ঘর, আকস্মিকভাবে পঙ্গু হয়েছিল সে। এরপর গল্প-কথক বলছিল ছালাম মিঞা নামের একজন জোতদারের কথা, যে মক্কা শরীফ পৌঁছে অন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

এরপর গল্প-কথক নিজের জীবনের বাল্য-শৈশবের গল্প শুনিয়েছিল স্টীমারের ডেকের যাত্রীদের। স্বভাবের জন্যেই ছোট বয়সে লোকে তাকে ‘পেঁচা’ বলে ডাকত। মেধাবী হওয়া সত্তে¡ও তার হয় নি লেখাপড়া। পরবর্তীতে সে অশিক্ষিত থাকার কষ্ট বুঝেছিল। তার বাবার মৃত্যুর পর সে স্টীমারের কেরানির কাজ নিয়েছিল, কিন্তু পরে স্টীমার চলাচল বন্ধ হওয়ার কারণে চলে যায় তার চাকরিটিও। তারপর সে যোগ দিয়েছিল আদালত পাড়ায় মুহুরীর কাজে। এ প্রসঙ্গে উপন্যাসে বলা হয়েছে : 

…তবে মানুষকে জীবিকার ব্যবস্থা করতে হয়। তাই বাপের মৃত্যু ঘটলে কিছু তদবির করে প্রথমে স্থানীয় স্টীমারঘাটে টিকেট কেরানির পদে নিযুক্ত হয়, পরে স্টীমারঘাট বন্ধ হলে কাছারি-আদালতেই ছোটখাটো একটি কলম-ঠেসার কাজ নিয়ে নেয়।

স্টীমারের ডেকের গল্প-কথককে কথক-‘আমি’ বা কথক-১ ভেবেছিল তবারক ভুঁইঞা। স্টীমার ঘাটের কেরানি তবারক ভুঁইঞার সে সময় পরিচয় ঘটেছিল কুমুরডাঙ্গার শিক্ষানবিশ ছোট হাকিম মুহাম্মদ মুস্তফার সঙ্গে। ‘আমি’ বা কথক-১ অপেক্ষা করে গল্প-কথক বা তবারক ভুঁইঞার মুখে মুহাম্মদ মুস্তফার কথা শোনার জন্যে। কিন্তু স্টীমার জলাপাড়া ঘাট ছেড়ে গেলেও সে বলে না মুহাম্মদ মুস্তফার কথা। সে বলে বাকাল নদী ভরে যাওয়ার কারণে কুমুরডাঙ্গার মানুষের দুর্ভাগ্যের কথা। স্টীমার ঘাটের সঙ্গে তবারক ভুঁইঞার সম্পর্ক বাল্যকাল থেকেই, স্মৃতিতে ভর করে সে তা বর্ণনা করে। স্টীমার ঘাট স্থাপন প্রসঙ্গে আশি বছরের পুরনো কাহিনীও গল্প-কথক শুনিয়েছিল স্টীমারের ডেকের যাত্রীদের।

কুমুরডাঙ্গার ছোট হাকিম মুহাম্মদ মুস্তফা চাকরিতে যোগ দিতে এসেছিল স্টীমারে চড়ে। স্টীমারে একজন পুলিশের দারোগার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল মুহাম্মদ মুস্তাফার। সে কুমুরডাঙ্গার মানুষ ও অন্যান্য প্রসঙ্গে তাকে ধারণা দিয়েছিল, কিন্তু তা ছিল দারোগার নিজস্ব মতামত যেন। কুমুরডাঙ্গার ছোট হাকিম মুহাম্মদ মুস্তফার মনে মনে ইচ্ছা ছিল বিয়ে করে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে চাকরিতে যোগ দেওয়ার। সে তার বন্ধু তসলিমের মাধ্যমে ঢাকাতে বিয়ের কথা পাকা করেছিল, কিন্তু আত্মীয়-ফুফাত বোন খোদেজার আকস্মিক মৃত্যু সংবাদ পেয়ে সে বিয়ের তারিখ পিছিয়ে দিয়েছিল।

গল্পকথক বা তবারক ভুঁইঞার মাধ্যমে জানা যায় স্টেশন মাস্টার খতিব মিঞার কথা। সে বিষন্ন বিচলিত হয়ে স্টীমার বন্ধের নোটিশ টাঙায়। ক্রমে এই সংবাদটি পৌঁছে যায় কুমুরডাঙ্গার সর্বত্র। স্টেশনে এসে এই সংবাদ জানতে পারে কুমুরডাঙ্গার বিখ্যাত উকিল কফিলউদ্দিন। উকিল কফিলউদ্দিন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নিয়ে বিষয়টি আলোচনা করে বার লাইব্রেরিতে। অন্যান্য উকিল, ব্যবসায়ী, পেশাজীবীসহ সকলেই বিষয়টিতে চিন্তিত হয়ে ওঠে। উকিল কফিলউদ্দিন মনে করে নদীতে ‘চড়া’ পড়ে নি, বরং স্টীমার কোম্পানি তাদের আয় বাড়ানোর জন্যে একটি ফন্দি পেতেছে। স্টীমার লাইনটি কামালপুর দিয়ে গেলে তাদের আয় বাড়বে বলে মনে করে উকিল কফিলউদ্দিন। তাই এক বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় উকিল কোম্পানির চালাকিটি জানিয়ে দেবে সরকারকে। উকিল কফিলউদ্দিন নানা তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছিল কুমুরডাঙ্গায় স্টীমার ফিরিয়ে আনার জন্যে। কিন্তু স্টীমার ফিরে আসতে দেরি হওয়ায় কুমুরডাঙ্গার সকলে ক্ষিপ্ত হয়ে নালিশ জানিয়েছিল বড় হাকিমের কাছে। 

গল্প-কথক তবারক ভুঁইঞার মাধ্যমেই জানা যায় মোক্তার মোসলেহউদ্দিনের মেয়ে মাইনর স্কুলের শিক্ষিকা সকিনা খাতুন প্রসঙ্গ। দরিদ্র পিতার মেয়ে, তার শারীরিক গড়ন হালকা-পাতলা। মায়ের অসুস্থতার জন্যেই সকিনা খাতুনের মাথায় পড়েছে তার বাবার সংসার। সকিনা খাতুন শিক্ষকতা করে পাওয়া অর্থ ব্যয় করে বাবার সংসারে। সকিনা খাতুনই স্টীমার ঘাটের ‘ফ্লাট’ বা প্লাটফর্মটি সরে যাওয়ার পর একটি আশ্চর্য শব্দ শুনতে থাকে। শব্দটি যেন কান্নার শব্দ, শব্দটি যেন নারীর এবং তা নদীর দিক থেকেই ভেসে আসে। সকিনা খাতুন কান্নার শব্দ শুনে বিচলিত হয়ে তার মাকে জানায় বিষয়টি। ক্রমে তা এলাকার মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে যায় এবং সর্বস্তরের মানুষের মধ্যেই সকিনা খাতুন সম্পর্কে একটি উৎসাহ জন্মায়। ক্রমে কান্নার শব্দজনিত প্রসঙ্গটি গ্রামের সাধারণ মানুষ থেকে শহরের প্রশাসনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। কান্নার শব্দের ক্ষেত্রে স্টীমার কোম্পানির কোন গোপন কারসাজি আছে কি না তা তদন্ত করেছে পুলিশ বাহিনী। মোল্লা-মৌলবীরা মনে করেছে কান্নার শব্দের ক্ষেত্রে শয়তানের ভূমিকা রয়েছে। তারা শহরের মধ্যে আজানের শব্দ প্রচার করে, ছদকা-শিরনি দেয় এবং বিভিন্ন মসজিদে করে বিশেষ প্রার্থনার ব্যবস্থা।

কুমুরডাঙ্গা শহরের উন্নতি ঘটেছিল উকিল কফিলউদ্দিনের হাতেই। সে প্রতিষ্ঠা করেছিল মসজিদ, স্কুল, ক্লাব ; বিনোদনের জন্য ব্যবস্থা করেছিল মরহুম ওয়ালেদের নামে ফুটবল প্রতিযোগিতা। কুমুরডাঙ্গার পশু-প্রাণী রক্ষার জন্য পশু ডাক্তারেরও ব্যবস্থা করেছিল সে। এমন কি কুমুরডাঙ্গার সরকারি কোন কর্মকর্তা ঘুষও নিতে পারতো না উকিল কফিলউদ্দিনের জন্যে। স্টীমার চলাচল বন্ধ হলে তার মনে গভীর দাগ কাটে। সে ভাবে প্রকৃতপক্ষে কুমুরডাঙ্গার অবনতি হয়েছে। তাই উকিল কফিলউদ্দিন সিদ্ধান্ত নেয় কুমুরডাঙ্গা থেকে বিদায় নিয়ে মহকুমা শহরে মেয়ে হোসনার কাছে গিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য তার, সবকিছু প্রস্তুত করে সাজানো বজরায় উঠতে গিয়ে সে তাতে উঠতে পারে নি। তখনই কেন যেন সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে এবং নদী তীরে মারা যায় উকিল কফিলউদ্দিন। তার মৃত্যুতে পরিচিত জনেরা হয়ে পড়ে হতবিহ্বল। ডা. বোরহানউদ্দিন তার মৃত্যুর কারণ হিসেবে হৃদপিন্ড বিকল হওয়ার কথা বলেছিল। কিন্তু ডাক্তারি সে কথা অনেকেই মানে নি সেদিন। তারা মনে করেছিল, উকিল কফিলউদ্দিন বজরায় ওঠার সময় নদীর কান্না শুনেছিল। কান্নার বিষয় নিয়ে গভীর উদ্বিগ্ন হবু মিঞা ও রহমত শেখ। একদিন কান্নার শব্দ শোনাকে তারা মনে করত সৌভাগ্যের। কিন্তু আজ তারা মহাপ্রলয়ের আশংকায় যত্নে এড়িয়ে যায় কান্নার প্রসঙ্গ। দর্জিপাড়ার রহমত শেখের জীবন বাঁচানোর ক্ষুদ্র অবলম্বন পান-বিড়ির একটি দোকান। সে ভাবে কুমুরডাঙ্গার আসন্ন বিপদে দোকানটি তার হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। তা হলে আবার পড়বে সে সীমাহীন অর্থকষ্টে। তাই সে চায় না কুমুরডাঙ্গায় হোক কোন দুর্বিপাক। সে তার নিজস্ব ভাবনায় বিপন্মুক্ত হওয়ার জন্যে বাকাল নদীতে পশু উৎসর্গ করে। গ্রামের অন্যেরাও রহমত শেখের ধারণা অনুযায়ী নদীতে উৎসর্গ করতে থাকে নানা দ্রব্য সামগ্রী। এতে তাদের দুশ্চিন্তার মাত্রা কমলেও তাদের মুক্তির পথ তারা পায় না। ফলে তাদের জীবন হয়ে পড়ে স্থবির। ঝিমিয়ে পড়া সেই জনগোষ্ঠীর জীবনে প্রাণের সঞ্চার করেছিল অবসর পাওয়া স্টীমারের স্টেশন মাস্টার খতিব মিঞা। সে কুমুরডাঙ্গায় স্থায়ীভাবে বসবাসের সিদ্ধান্ত নেয়। সে ঠিক করে, শহরের কাছাকাছি একখন্ড জমি কিনে ঘর-বাড়ি তৈরি করবে। এই সিদ্ধান্তের কথা সে কুমুরডাঙ্গার উকিল আরবাব খান, ডা. বোরহানউদ্দিনসহ কাছারি-আদালতপাড়ার মানুষদের জানিয়েছিল। সে আরও জানিয়েছিল, কুমুরডাঙ্গার মাটির মমতার কথা, উর্বরতার কথা, মাটিতে জন্মানো সোনালী ফসলের কথা। কুমুরডাঙ্গার মাটির এমন গৌররের কথা খতিব মিঞা ছাড়া কেউ কখনও বলে নি। তার এ কথাগুলো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে কুমুরডাঙ্গার মানুষের কানে। ফলে তারাও খতিব মিঞার মতো কুমুরডাঙ্গার মাটির মমতার কথা বুঝতে পারে। ফলে আবার কুমুরডাঙ্গার স্থবির জীবনে নেমে আসে গতি, প্রাণ-চঞ্চলতা।

কথক ‘আমি’ বা কথক-১ মুহাম্মদ মুস্তফার চাচাত ভাই। সে স্টীমারের ডেকের যাত্রী। ডেকের অন্য একজন যাত্রী কথক-২ বা গল্প-কথক তবারক ভুঁইঞা আপনমনে স্টীমার যাত্রীদের কাছে গল্প বলছিল। কথক-১ বা ‘আমি’ তার গল্প বলা লক্ষ করে এবং তার মুখে একটি শহরের নাম শুনে, চাচাত ভাই মুহাম্মদ মুস্তফার কথা শোনার জন্যে অপেক্ষা করে। এ প্রসঙ্গে সে স্মৃতিচারণ করতে থাকে মুহাম্মদ মুস্তফার বাল্য, কৈশোর ও যুবক বয়সের জানা সব বৃত্তান্ত। তাতে উপন্যাসে মুহাম্মদ মুস্তফার মনোজগত এবং তার নিজ গ্রাম চাঁদবরণঘাটের সমাজ ও প্রতিবেশের চিত্র উপস্থাপিত হয়। 

মুহাম্মদ মুস্তফা কুমুরডাঙ্গার স্টীমার ঘাটে উপস্থিত হয়েছিল বিয়ে করতে ঢাকায় যাওয়ার জন্যে। কিন্তু সে দিন থেকেই স্টীমার চলাচল বন্ধ হয়েছিল। ফলে মুহাম্মদ মুস্তফা সেবার ঢাকা যেতে পারে নি। বন্ধু তসলিমের মাধ্যমে পূর্ব নির্ধারিত তারিখে তার বিয়ে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও তা স্থগিত হয়েছিল সেদিন। মুহাম্মদ মুস্তফার ফুফাত বোন খোদেজার আকস্মিক মৃত্যু-সংবাদের কারণে বিয়ের তারিখ পিছিয়েছিল। তার বাড়ির লোকেরা ভেবেছে মুহাম্মদ মুস্তফার জন্যেই খোদেজা আত্মহত্যা করেছে। মুহাম্মদ মুস্তফার বাবা তার বিধবা বোনকে নিতান্ত সান্ত¦না দিয়ে বলেছিল-তার ছেলের সঙ্গে বিয়ে দেবে বোনের মেয়ে খোদেজার। সে কথার সূত্র ধরেই বাড়ির লোকেরা খোদেজার মৃত্যুর দায়ভার চাপিয়ে দেয় মুহাম্মদ মুস্তফার কাঁধে। মুহাম্মদ মুস্তফা বিয়ে ঠিক করে চিঠির মাধ্যমে বাড়িতে জানিয়েছিল। বিয়ের সংবাদ শুনে খোদেজা ভীষণ ভেঙে পড়েছিল। সে বাড়ির পেছনে পুকুর ঘাটে গিয়ে আর ফিরে আসে নি। পরে শেওলা আবৃত পুকুরে তাকে মৃত পাওয়া গিয়েছিল। এটি মৃত্যু না আত্মহত্যা এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোন প্রমাণ না থাকলেও বাড়ির মানুষেরা মনে করে খোদেজা মুহাম্মদ মুস্তফার বিয়ের সংবাদ সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে। কেননা সে ভালোবাসতো মুহাম্মদ মুস্তফাকে। এ প্রসঙ্গে বাড়ির লোকেরা নানা ঘটনার জন্ম দেয়।

কথক-১ বা ‘আমি’র স্মৃতিচারণের মাধ্যমেই জানা যায় মুহাম্মদ মুস্তফার জীবনের পটভূমি। জীবনের শুরুতেই তার পরিচয় ঘটেছিল ভয়ের সঙ্গে, কুসংস্কারের সঙ্গে। তাদের বাড়ির পেছনের তেঁতুল গাছ সংশ্লিষ্ট কালু গাজির গল্প এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। মুহাম্মদ মুস্তফার বাবার নাম খেদমতুল্লা, তার সম্পর্কে কথক-১ বা ‘আমি’ স্মৃতিচারণ করে। জীবনের শুরুতে সে ছিল সদাহাস্য, প্রাণচঞ্চল ও সকলের প্রিয় একজন মানুষ। সে গান করত, কখনও সে দরবেশ সেজে দেশান্তরী হওয়ার কথাও ভাবত। একপর্যায়ে সে বিভিন্ন ব্যবসায় জড়িয়েছিল কিন্তু কোন ব্যবসায় উন্নতি করতে পারে নি। অর্থাভাব তার লেগেই থাকত। এমন দুর্দিনেই সে অকাল বিধবা নারী অমেনাকে বিয়ে করেছিল। বিয়ের পর কাপড়ের ব্যবসায় আর্থিক উন্নতি হয়েছিল খেদমতুল্লার। তবে, কলে উৎপাদিত কাপড়ের এ ব্যবসাটি দীর্ঘদিন আয়ত্তে রাখতে পারে নি সে। লাভজনক এ ব্যবসায় মাড়োয়ারিরা যোগ দেয় ; ফলে তাদের বুদ্ধি- কৌশলের কাছে পরাজিত হয় খেদমতুল্লা। ব্যবসা হারিয়ে সে মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত হয়। এর পর খেদমতুল্লা আদালতে সাক্ষী দেওয়ার কাজকে পেশা হিসেবে বেছে নেয়। ফলে ক্রমে তার মন-মেজাজ নষ্ট হয়ে যায়। পরিবারের প্রতি-সে হয়ে ওঠে নিষ্ঠুর। তার চরিত্রে ভর করে বিকৃতস্বভাব। কিন্তু ছেলেকে উকিল বানানোর স্বপ্ন দেখতো সে। তার স্বপ্ন পূরণ না হতেই আততায়ীর হাতে প্রাণ হারায় খেদমতুল্লা। তার মৃত দেহ পাওয়া গিয়েছিল কামলাতলা বিলের মধ্যে।

খেদমতুল্লার মৃত্যুর পর তার স্ত্রী-পুত্র চাঁদবরণঘাটের বাড়ি বিক্রি করে গ্রামে চলে যায়। সে দিন থেকে মুহাম্মদ মুস্তফা লেখাপড়া শিখে মানুষ হওয়ার প্রতিজ্ঞা করেছিল। সে লেখাপড়া শিখতে গিয়েছিল শহরে। দু’বছর পর ছুটিতে শহর থেকে গ্রামে এসে সে রাস্তায় হাঁটতে বের হয়ে পৌঁছেছিল শৈশবের চেনা মুক্তাগাছি গ্রামের বিখ্যাত বটগাছতলায়। যেখানে বসবাস করে খেদমতুল্লার কথিত খুনী কালু মিঞা। ঘটনাক্রমে সে দিন মুহাম্মদ মুস্তফা কালু মিঞার লোকদের নজরে পড়েছিল। তারা ধারণা করেছিল, মুহাম্মদ মুস্তফা পিতৃহত্যার বদলা নেওয়ার জন্যেই সেখানে গিয়েছিল। ফলে কালু মিঞার লোকেরা হয়েছিল সতর্ক এবং নিয়েছিল মুহাম্মদ মুস্তফাকে অপদস্থ করার কৌশল। তারা দুদিন পর অসুস্থ-বৃদ্ধ কালু মিঞাকে উপস্থিত করে মসজিদে। জুমার নামাজের জন্য উপস্থিত অনেক মানুষের সামনে সে খেদমতুল্লা হত্যার সঙ্গে জড়িত না থাকার কথা বলেছিল। এ পরিস্থিতিতে মুহাম্মদ মুস্তফার বাড়ির মানুষের মনে জেগেছিল আশা। তারা ভেবেছিল মুহাম্মদ মুস্তফা পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নেবে। এক পর্যায়ে মুহাম্মদ মুস্তফার বাড়ির লোকদের ধারণা পাল্টে যায়। সে চাচাত ভাই কথক-১ বা ‘আমি’কে পাঠিয়েছিল কালু মিঞার কাছে। মুহাম্মদ মুস্তফা যে পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নিতে আসে নি সে কথা জানানোর জন্যে। কিন্তু চাচাত ভাই সে দিন সে কথা জানাতে যায় নি কালু মিঞার বাড়ি। ফলে তারা তাদের কৌশল অনুযায়ী মুহাম্মদ মুস্তফাকে অপমান করে। তারা একটি বারো-তের বছরের ছেলে ‘খেদমতুল্লার একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ’ দেখিয়ে বলেছিল ছেলেটির জন্মদাতা মুহাম্মদ মুস্তফা। তারা ছেলেটির ভরণ-পোষণ দাবি করে। অন্যথায় গ্রামের গণ্য-মান্য লোকদের মাধ্যমে দাবি আদায় করে নেবে। এমতাবস্থায় মুহাম্মদ মুস্তফা নিজ মর্যাদা রক্ষার জন্যে গভীর রাতে গিয়ে কালু মিঞার সঙ্গে সমঝোতা করেছিল। সে সুবাদেই পরবর্তীতে এ বিষয়ে আর কোন কথা শোনা যায় নি। এ বিষয়ে উপন্যাসে আছে : সে-রাতে মুহাম্মদ মুস্তফা কোথায় গিয়েছিলো, কার সঙ্গে দেখা করেছিলো, দেখা করে কি বলেছিলো-সব কথা কখনো সে না বললেও আমরা ঠিক অনুমান করতে পেরেছিলাম।

তারপর মুক্তগাছি গ্রামের কালু মিঞার বাড়ির দিক থেকে আর কোন সাড়া পাওয়া না গেলে, এবং বাপজান তার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করলে অনুমানটি নিশ্চিত জ্ঞানে পরিণত হয়।

মুহাম্মদ মুস্তফার মনে খোদেজার আত্মহত্যা গভীর দাগ কাটে। বস্তুত, বাড়ির মানুষের নানা রকম মন্তব্যই এর জন্যে দায়ী। মানসিক শান্তির জন্যেই মুহাম্মদ মুস্তফা বিষয়টি জানিয়েছিল তবারক ভুঁইঞাকে। তাদের পারিবারিক পরিস্থিতির জন্যেই মুহাম্মদ মুস্তফাকে এই সন্দেহের আগুনে পুড়তে হয়েছে। মুহাম্মদ মুস্তফার সামাজিক অবস্থার কারণেই সম্ভব নয় খোদেজার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হওয়া। বরং খোদেজার সম্পর্ক তৈরি হয়েছিলো মুহাম্মদ মুস্তফার চাচাত ভাই কথক-১ বা ‘আমি’র সঙ্গে। সে কথা জানা গেছে এক সন্ধ্যায় পুকুর ধারের নির্জনে সাদা মুরগী খোঁজার সময় তাদের বলা কথাবর্তায়। ফলে, কথক-১ বা ‘আমি’ জানে খোদেজা মুহাম্মদ মুস্তফার বিয়ের খবর শুনে আত্মহত্যা করে নি। কিন্তু তাদের বাড়ির মানুষের বলা নানা কাহিনীতে কান দিয়ে মুহাম্মদ মুস্তফা বিশ্বাস করতে শুরু করে খোদেজার আত্মহত্যার কারণটি। ক্রমে নিজেকে অনেকটা দায়ী ভাবতে থাকে খোদেজার মৃত্যুর জন্যে। খোদেজার মৃত্যুর বিষয়টি দ্রুত প্রভাব বিস্তার করতে থাকে তার মনে। সে নিজ বাসস্থানে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে আধোঘুম, আধো জাগরণে দেখে চাঁদবরণঘাট, পরিচিত স্থান, নদী গ্রাম-গঞ্জ। সে স্বপ্ন দেখে শ্যাওলা আবৃত ডোবা, হিংস্র জন্তুর নখের আঁচড়ে ক্ষত-বিক্ষত হওয়া ডোবা থেকে ভেসে ওঠা মৃত মানুষের মুখ, স্পষ্ট বুঝতে পারে না সে কি মৃত খোদেজা, না অন্য কোন মানুষের মুখ। এ স্বপ্ন-দুঃস্বপ্নকে সে মিলিয়ে নেয় নিজের জীবনের সঙ্গে। সে ভাবে এ থেকে তার মুক্তি নেই। তার মনে বিশ্বাস জন্মে, খোদেজা প্রতিহিংসামূলক আত্মায় পরিণত হয়েছে। সে আত্মার প্রতিশোধস্পৃহা থেকে মুক্তি পাওয়া অসম্ভব। তাই সে নিজের মুক্তির পথ খোঁজে। মুহাম্মদ মুস্তফার মনে জন্মে বিশ্বাস, প্রতিহিংসামূলক আত্মার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার একমাত্র উপায় আত্মহত্যা করা। তাই সে আত্মহত্যার জন্যে সচেষ্ট হয়। অবশেষে মুহাম্মদ মুস্তফা আত্মহত্যা করেই মুক্তি লাভ করেছিল যেন খোদেজার প্রতিশোধপরায়ণ দুষ্ট আত্মার কবল থেকে।

‘কাঁদো নদী কাঁদো’ উপন্যাসের কাহিনী উপস্থাপিত হয়েছে দু’জন কথকের মাধ্যমে। ‘লোকটিকে যখন দেখতে পাই’ উপন্যাস শুরুর এই বাক্যাংশের মধ্যে রয়েছে কথক দু’জন। যে ‘লোকটি’-কে দেখতে পায় সে কথক-১ এবং দেখতে পাওয়া লোকটি কথক-২। এদের মাধ্যমে উপন্যাসের কাহিনী বর্ণানাত্মকভাবে অগ্রসর হয়েছে দুটি ধারায়। ক্রমে ক্রমে এই কথক দু’জন : কথক-১ মুহাম্মদ মুস্তফার চাচাত ভাই এবং কথক-২ মুহাম্মদ মুস্তফার ঘনিষ্ঠ তবারক ভুঁইঞা বলে পরিচিতি পায়। কথক-২ বা তবারক ভুঁইঞার কণ্ঠে কুমুরডাঙ্গার কথা শুনে কথক-১ বা মুহাম্মদ মুস্তফার চাচাত ভাইয়ের স্মৃতি জেগে ওঠে। তার সে স্মৃতি রোমন্থনই মুহাম্মদ মুস্তফার জীবনালেখ্য। দু’জন কথক সম্পর্কে একজন সমালোচক বলেছেন :

‘কাঁদো নদী কাঁদো’ উপন্যাসের অন্তর্বয়ন ভাবানুষঙ্গ-জটিল। কেন্দ্রীয় চরিত্র নয়, লেখকের সীমাবদ্ধ দৃষ্টিকোণ এবং তবারক ভূঁইয়ার নিয়ন্ত্রিত-প্রেক্ষণবিন্দু-যুগ্মভাবে একে অপরের মাঝে অনুপ্রবিষ্ট হয়ে তাদের অনুচ্চারিত ও উচ্চারিত বাক্যস্রোতে রীতিমতো একটি নদীর ধারায় পরিণত হয় ; এখানেই ‘কাঁদো নদী কাঁদো’র উপকরণ উৎস।

নদী ও মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক-চিত্রের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তবারক ভুঁইঞার কথা বলা। কেননা নদীতে ভাসমান জাহাজে চড়ে যাত্রীরা রওনা হয়েছিল যার যার গন্তব্যে। নদী ও মানুষের এই নির্ভরশীলতা বহুকাল থেকেই চলে আসছে। বাঙালির যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যতম মাধ্যম নদীপথ- নৌকা, জাহাজ, লঞ্চ। বর্তমান কালেও বহু মানুষ এই সব বাহনের সাহায্যেই মানুষ একস্থান থেকে অন্য স্থানে আসা-যাওয়া করে। জাহাজে তৃতীয় শ্রেণীর যাত্রী তবারক ভুঁইঞা সহযাত্রীদের সঙ্গে গল্পের আসর পেতেছিল। জাহাজে অলস সময় কাটাতে কেউ কেউ তাসও খেলছিল। পড়ন্ত বিকেলে এই জাহাজের ডেকের হট্টগোলে তন্দ্রাচ্ছন্ন কথক-১ শুনতে পায় তবারক ভুঁইঞার বিবরণ। কুমুরডাঙ্গার নাম শুনেই কথক-১ এর চৈতন্য প্রসারিত হয়। সে চোখ মেলে তাকায়, নদী তীরবর্তী জনপদের দৃশ্য দেখে, ছায়া সুনিবিড় সবুজে ঘেরা গ্রাম, তার বুক চিরে বয়ে চলা মেঠো পথ। দেখতে দেখতে সে লক্ষ করে গল্প কথককে।

কথক-২ বা তবারক ভুঁইঞার কণ্ঠে অখ্যাত হরতনপুর গ্রামের কথা। সেখানকার অধিবাসী জোলাদের জীবন যন্ত্রণার চিত্র উপস্থাপিত হয়েছে মোকসেদ জোলার মাধ্যমে। তারা সারা বছরই একের পর এক কৃষি কাজ করে। জীবনযাত্রা নির্বাহ করতে তারা কঠিন পরিশ্রম করে। তারপরও তাদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয় না। কখনও অতিবৃষ্টিতে ফসল নষ্ট হয়, কখনও অনাবৃষ্টিতে ফসল জন্মে না, কখনও ফসল জন্মালেও শিলাবৃষ্টি তা ধ্বংস করে দেয়। কখনও বা বন্যায় ভাসিয়ে নিয়ে যায় ক্ষেতের ফসল ঘর-বাড়ি। প্রকৃতির নিদারুণ নিষ্ঠুর খেলায় তারা প্রায়ই হয় সর্বস্বান্ত। তখন জীবন বাঁচানো হয়ে পড়ে দায়। এমন কি মাঝে মধ্যে তাদের ঘরবাড়ি আগুনে পুড়ে যায়। এমনই সব প্রাকৃতিক বিপদ নেমে এসেছিল মকসুদ জোলার জীবনেও। আর্থিক দুরবস্থা কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই তার জীবনে দুর্ভাগ্যের মাত্রা বেড়ে যায় আরও। অসময়ে অকালে সে হারায় আপনজন। ফলে প্রায় নিঃস্ব মকসুদ জোলা জীবন বাঁচানোর সংগ্রামে আবারও ঝাঁপিয়ে পড়ে। সে কাঠ কাটতে বনে যায়। কিন্তু দুর্ভাগ্য তার পিছু ছাড়ে না। কাঠুরের পেশায়ও তার দুঃখ ঘোচে না। কুড়ালির আঘাতে পা হারিয়ে সে হয় পঙ্গু। প্রকৃতির খেয়ালে তার জীবনে বার বার নেমে আসা দুর্যোগ সম্পর্কে একজন সমালোচক বলেছেন :

‘মকসুদ জোলা এক কারণহীন ভাগ্যদোষে নিরন্তর পীড়িত হতে হতে সবশেষে পঙ্গু হয়ে পড়ে। তার নিজের দোষে নয়-ভাগ্যদোষে। এই নিয়তি ওয়ালীউল্লাহর আগের দুটি উপন্যাসেও কাজ করেছে- কিন্তু ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ উপন্যাসে নিয়তির পরাক্রম চূড়ান্ত আকার ধারণ করেছে।’

তবারক ভুঁইঞা আরও একজন মানুষের কথা তুলে ধরেছিল ডেকের যাত্রীদের কাছে। লোকটি সালাম মিঞা। সে জোতদার। হয়তো তার জীবনে পাপ ছিল, সে পাপের প্রায়শ্চিত্তের কথাই প্রকাশ পায় কথক-২ এর কথায়। জোতদাররা ছিল অত্যাচারী, তারা জমি-জমা নিয়ে নানা মামলা-ফ্যাসাদে জড়িয়ে মানুষকে বিপদগ্রস্ত করত। সে সব ঘটনা যেন, ‘বৃটিশ আমলের শেষভাগের এবং পাকিস্তান আমলের প্রথমভাগের গ্রামীণ সমাজের পরিবর্তনমুখী বাস্তবতার চিত্র।’ জোতদার সালাম মিঞা প্রথাগত ধর্মবিশ্বাসকেই আঁকড়ে ধরে। সে তার পাপ মোচন করতে যায় মক্কাশরীফ। কিন্তু দুর্ভাগ্য তার, সে অকস্মাৎ হয়ে যায় অন্ধ। তখন সে চিৎকার করে কাঁদে, আর্তনাদই যেন তার পাপের শাস্তি। এ যেন সীমা অতিক্রমকারী একজন শক্তিশালী জোতদারের ওপর প্রকৃতির প্রতিশোধ। এ প্রসঙ্গে বলা যায়, ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ ব্যক্তির সুতীব্র সংকটের রূপায়ণ। চেতন অবচেতন লোকে ভ্রাম্যমান মানুষের অস্তিত্ব জিজ্ঞাসার নিপুণ ছবি এই উপন্যাস।’

কথক-২ বা তবারক ভুঁইঞা নিজ শৈশবের কথা শোনায় ডেকের যাত্রীদের। বাল্যকালে সে ছিল দুরন্ত প্রকৃতির। পাড়া-মহল্লায় ঘুরে-ঘুরেই কাটত তার সময়। লেখাপড়ায় মনোযোগ ছিল না তার। বাল্য বন্ধুরা যখন ব্যস্ত থাকত অন্যের বাগানের ফল চুরিতে, কিংবা খেলাধুলায়-তখন সে পাড়া-মহল্লা ঘুরে বেড়াত। দেখত সে মানুষের জীবনের নিত্যদিনের ঘটনাচিত্র। তা তার জীবনে অভ্যাসে পরিণত হয়। লেখাপড়া শোখানোর জন্যে তাকে শহরের স্কুলে ভর্তি করা হয়েছিল। তার বাবার স্বপ্ন ছিল ছেলে নামকরা উকিল-হাকিম-ডাক্তার হবে। পিতার মৃত্যুর পর যখন শিক্ষার অভাবে সে কোন পেশাতেই নিয়োজিত হতে পারছিল না তখন স্কুল থেকে পালানোর জন্যে তার মনে জেগেছিল তীব্র অনুশোচনা। মানুষের বেঁচে থাকার জন্যে একটি নির্দিষ্ট পেশার কাজ থাকা গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমে সে স্টীমার ঘাটের কেরাণি হয়েছিল, পরে আদালতে মুহুরির কাজ নিয়েছিল। নিজের প্রসঙ্গে সে বলে : “সে-জন্যেই জীবনে কিছু হয়নি। পরের জীবনের দিকে তাকিয়ে দিন কাটিয়েছি, নিজের জীবনের কথা ভাবার সময় হয়ে ওঠেনি।”

কথক-২ এর মুখে কথক-১ শুনতে পায় কুমুরডাঙ্গার কথা। তাতে কথক-১ বিচলিত হয়ে ওঠে। তার মনে জাগে বেদনাভরা এক অতীতের কথা। কুমুরডাঙ্গার ছোট হাকিম বা মুহাম্মদ মুস্তফা সম্পর্কে জানার জন্যেই কথক-১ অপেক্ষা করে, সে কথক-২ কে ভাবে তবারক ভুঁইঞা। কেননা তার সঙ্গে মুহাম্মদ মুস্তফার ছিল সুহৃদ-সম্পর্ক। তবারক ভুঁইঞার মাধ্যমে জানা যায় কুমুরডাঙ্গার স্টীমার ঘাটের কথা। স্টীমার ঘাটকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে উপশহর বা মফস্বল শহর কুমুরডাঙ্গা। তাদের প্রাণের স্পন্দন যেন অব্যহত ছিল এই ঘাটকে কেন্দ্র করে। এই স্টীমার ঘাটই কুমুরডাঙ্গার মানুষদের এতদিন বাইরের জগতের সঙ্গে সংযুক্ত করে রেখেছিল। বাকাল নদীতে হঠাৎ চর পড়ে তার গভীরতা নষ্ট হয়। ফলে, স্টীমার চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। তাতে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে কুমুরডাঙ্গার উকিল, ডাক্তার, হাকিম, শিক্ষক, ব্যবসায়ীসহ সর্বস্তরের মানুষ। শহরের ব্যবসা বাণিজ্যে নামে স্থবিরতা। উপন্যাসে ‘কুমুরডাঙ্গার বর্তমানলগ্ন ঘটনাপ্রবাহ অনুসন্ধান করতে গিয়ে ‘আশি বছর’-পূর্ববর্তী সময়কাল থেকে সংঘটিত ঘটনা ও তার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার রূপায়ণ ঘটেছে। ‘বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন’, ‘ইংরেজ ও হিন্দুদের মধ্যে প্রচুর মনোমালিন্যের ভাব’, জমিদারদের প্রতিশোধ স্পৃহা, পেশী শক্তির আধিপত্য, কুমুরডাঙ্গার অধিবাসীদের ‘অতিশয় হিংস্র প্রকৃতি’, বহির্বিশ্ব থেকে দূরবর্তী থাকার ফলে অন্ধ সংস্কার ও বিশ্বাসে আস্থা প্রভৃতি প্রসঙ্গ’ ঔপন্যাসিক সংযোজিত করেছেন।

তেমনই একটি ঘটনা কুমুরডাঙ্গার স্টীমার ঘাট উদ্বোধন। স্টীমারঘাট উদ্বোধন করতে কোম্পানির কর্মকর্তারা স্থানীয় গণ্যমান্য লোকদের দাওয়াত করেছিল। ঘাটটি সাজানো হয়েছিল বহু বর্ণে। পুলিশের বাদকরা এসেছিল বাজনা বাজাতে। ঢাক-ঢোল পিটিয়ে স্টীমারঘাট উদ্বোধন অনুষ্ঠানে কুমুরডাঙ্গার মানুষদের জানানো হয়েছিল আমন্ত্রণ। জনতার আগ্রহ-উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানটি হয়েছিল জাঁকজমকপূর্ণ। কিন্তু অনুষ্ঠানটি শেষ হওয়ার আগেই তা ভেঙে গিয়েছিল। অনুষ্ঠানটি ভেঙে দিয়েছিল স্থানীয় জমিদারের লাঠিয়াল বাহিনী। স্টীমার কোম্পানির কর্মকর্তারা স্টীমারঘাট উদ্বোধন অনুষ্ঠানে স্থানীয় জমিদারকে দাওয়াত করতে ভুলে গিয়েছিল। তাতে অপমান বোধ করেছিল জমিদার। তাই সে অপমানের প্রতিশোধ নেয় নিজের পোষা গুন্ডা দিয়ে অনুষ্ঠান পন্ড করে। সে সময়কার ‘বাংলাদেশের বিশেষত ব্রিটিশ আমলের শেষভাগের এবং পাকিস্তান আমলের প্রথমভাগের গ্রামীণ সমাজের’ সামন্ত-জমিদাররা রাখতো গুন্ডা বাহিনী। নিজস্ব শক্তিতে তারা খেয়াল-খুশিমতো কাজ করত। তাদের বিরুদ্ধে স্থানীয় প্রশাসনও ব্যবস্থা নিতে পারত না। সে দিনের অনুষ্ঠান ভাঙার অপরাধে জমিদারের কোন শাস্তি হয় নি। শাস্তি হয়েছিল লাঠিয়ালদের। সামন্ত-জমিদার আর ভূ-স্বামীরা ‘ব্যক্তি-স্বার্থের অচলায়তনে বন্দী। এদের কার্যকলাপ সমাজের সাধারণের স্বার্থের যেমন পরিপন্থী, তেমনি এদের নিজেদের জীবনের সুস্থতার পরিবাহী নয়।’ তবারক ভুঁইঞার ‘দৃষ্টিবান থেকে ধরা পড়ে কুমুরডাঙ্গার জীবনের ইতিহাস, বাকাল নদীর মরে যাওয়ার ফলে শুধু বস্তুগত জীবনের ক্ষয়-ক্ষতির ইতিহাসই যে তবারক জানায় তা নয়, নানাবৃত্তির নরনারীর জীবনের বিশ্বাস, সংস্কার-দ্ব›দ্ব ধীরে ধীরে হতাশা থেকে প্রত্যাশায় উত্তরণ তার ইতিহাসও সে তুলে ধরে।’

কুমুরডাঙ্গা স্টীমার ঘাটের স্টেশন মাস্টার খতিব মিঞা জানে বাকাল নদীতে চলা স্টীমার কুমুরডাঙ্গার মানুষের জীবনে কত তাৎপর্যপূর্ণ। এবং তা অনুমান করা যায় একজন লেখকের নদী ও জীবন সম্পর্কিত উক্তিতে : ‘পৃথিবীর প্রাচীন সভ্যতাগুলো নদীর তীরেই গড়ে উঠেছে। গড়ে উঠেছে বসতি ও কলকারখানা। পৃথিবীর অধিকাংশ পণ্য এখনও নদী ও সমুদ্র পথেই আমদানি-রপ্তানি হয়। পৃথিবীর বড় বড় বন্দরগুলো নদীর মোহনায় সমুদ্রের ক‚লে গড়ে উঠেছে।’ তাই খতিব মিঞা বিচলিত হয়ে পড়ে স্টীমার কোম্পানির সদর অফিস থেকে ‘তার’ মারফতে জানা স্টীমার না আসার সংবাদে। তার দীর্ঘ কর্মময় জীবনে এমন ঘটনা আর ঘটে নি। ফলে সে ঘটনার আকস্মিকতায় হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। কুমুরডাঙ্গার মানুষের প্রতি ধেয়ে আসা বিপদ দেখে সে অসহায় বোধ করে। কিন্তু তার কি-ইবা করার আছে ? টিকিট কেরাণিকে দিয়ে সে স্টীমার বন্ধ হওয়ার নোটিশ ঝুলিয়ে দেয় যদিও অধিকাংশ নিরক্ষর যাত্রীদের কাছে এ নোটিশ কোন গুরুত্ব বহন করে না। তবু সে ‘আইন’ মান্য করে নোটিশ দেয়। কোন মালই স্টেশন থেকে বাইরে চালান করা যাবে না। অসহায় স্টেশন মাস্টার খতিব মিঞা নিজ মনেই বলে ওঠে, ‘কলাগুলো পচবে’ । স্থানীয় কৃষিজীবীরা উৎপাদিত পণ্য শহরে চালান করে অধিক হারে অর্থ পেত। এখনও গ্রাম-গঞ্জ থেকে কৃষক-ব্যবসায়ীরা নানা কাঁচামাল শহরে চালান করে। হঠাৎ সে ব্যবস্থা ব্যহত হলে ভেঙে পড়ে স্বাভাবিক জীবন-ব্যবস্থা। ক্ষতিগ্রস্ত হয় তারা আর্থিকভাবে। অনুরূপ খতিব মিঞা কুমুরডাঙ্গার কলাচাষীদের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কায় দিশেহারা যেন। বাকাল নদীতে স্টীমার চলাচল বন্ধ হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সব শ্রেণীর মানুষ। ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে ব্যক্তিক পারিবারিক নানা ক্ষেত্রেই কুমুরডাঙ্গার মানুষের যেতে হয় মহাকুমা শহরে। তাই যোগাযোগের ক্ষেত্রে স্টীমার ছাড়া উপায় নেই। ফলে স্টীমার বন্ধ হওয়ার বিষয়টি হয়ে ওঠে স্পর্শকাতর। কুমুরডাঙ্গার মানুষেরা এর পূর্বেও ঐক্যবদ্ধভাবে সাহসের সঙ্গে মোকাবেলা করেছে তাদের জীবনের নানা প্রতিক‚লতা। এবারও যেন তারা এই পরিস্থিতি সামাল দেবে। কুমুরডাঙ্গার প্রতিনিধি উকিল কফিলউদ্দিন। সে রেগে বলে “কোথায় চড়া পড়েছে, কেই-বা বলেছে চড়া পড়েছে ?” কফিলউদ্দিন সফল আইনজীবী, অনেক বড় বাড়ির মালিক সে। অন্যান্য বড় বাড়ির তুলনায় তার বাড়িই বড়। তার সহায়-সম্পদ পৈত্রিকসূত্রে প্রাপ্ত নয়, নিজের যোগ্যতাবলেই সে তা অর্জন করেছে। তার অতি আদুরে মেয়ে হোসনা স্বামীসহ থাকে মাহকুমা শহরে। বেশিদিন তাকে না দেখে উকিল কফিলউদ্দিন থাকতে পারে না। নদীপথে মাঝে-মধ্যেই তাকে তাই শহরে যেতে হয়। একদিন সে শহরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে স্টীমার ঘাটে এসে শুনতে পায় স্টীমার বন্ধের খবর। উকিল কফিলউদ্দিন এই সহজ কথাটি সহজে নেয় নি। সে মনে করেছে স্টীমার বন্ধ হওয়া ষড়যন্ত্রমূলক ঘটনা। তাই সে উকিল, মোক্তার, ডাক্তার, ব্যবসায়ীদের নিয়ে বৈঠক করে। বাকাল নদী মরে যাওয়ায় স্টীমার বন্ধ হওয়া প্রসঙ্গে উকিল কফিলউদ্দিন মনে করে এটা তাদের অজুহাত মাত্র। তাদের উদ্দেশ্য অন্য, তারা স্টীমার চলাচলের নতুন পথ তৈরি করেছে কামালপুর। সেখানে হয়েছে পাটের কল, ফলে মানুষের যাতায়াত বেশি। অধিক মানুষের যোগাযোগের ফলে স্টীমারে টিকিট বিক্রিও বাড়বে। তাতে বৃদ্ধি পাবে স্টীমারের আয়। এটি স্টীমার কোম্পানির চালাকি বলে ধারণা করে কফিলউদ্দিন। জনগণের স্বার্থবিরোধী এই ধরনের কাজ হতে না দেওয়ার জন্যে বৈঠকে বিষয়টি সরকারকে জানানোর সিদ্ধান্ত হয়।

এ প্রসঙ্গে উপন্যাসে আছে :

“চড়ার উছিলায়ই স্টীমার বন্ধ করা হয়েছে। এ-অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমরা যদি প্রতিবাদ না করি, তবে স্থায়ীভাবে স্টীমার বন্ধ হয়ে যাবে।” কনিষ্ঠ উকিল আরবাব খানের প্রতি সে দৃষ্টি দেয়। “তুমি একটা খসড়া তৈরি করো। জোর কলমে সরকারের কাছে পত্র লিখতে হবে। এ-অন্যায় কী করে আমরা সহ্য করতে পারি ?”

পেশাগতভাবে ওকালতিতে কফিলউদ্দিন অর্থ-বিত্ত, নাম-যশ অর্জন করেছে প্রচুর। তার রয়েছে জুনিয়র উকিল আরবাব খান। কুমুরডাঙ্গার আদালত পাড়ায় আইন ব্যবসা চলে জমজমাট। আইন ব্যবসার মতো ডাক্তারি পেশা তেমন জমে না সেখানে। বোরহানউদ্দিন কুমুরডাঙ্গার ডাক্তার। সে ‘অকাল বৃদ্ধ’ ; বয়স চল্লিশ বছর হওয়ার আগেই ‘শিরদাঁড়া-বাঁকা’ হয়ে ন্যূব্জ হয়ে যায় । মাথার চুল প্রায় অর্ধেক সাদা হওয়া ডা. বোরহানউদ্দিন পোশাক-পরিচ্ছেদেও তেমন সচেতন নয়। মনের হতাশা মুখে ফুটে থাকলেও আপসোস-অনুশোচনা করে না সে। কুমুরডাঙ্গার রোগীরা রোগের শুরুতেই চিকিৎসার জন্যে আসে না ডা. বোরহানউদ্দিনের কাছে ; তারা আসে রোগের শেষ পর্যায়ে। তখন চিকিৎসা করে রোগ ভালো করানো যেন আজরাইলের সঙ্গে যুদ্ধ করা। এ সব রোগী দরিদ্র। অর্থাভাবেই তারা ডাক্তার দেখায় না। খরচ বাঁচাতে গিয়ে মৃতপ্রায় হয়েই তারা আসে ডা. বোরহানউদ্দিনের কাছে। তারা সাধারণত আসে নৌকায়। কিন্তু টাকার অভাবে তারা ঔষধ কিনেও খেতে পারে না। আর যে সব রোগীরা আর্থিকভাবে ভালো তারা মহাকুমা শহরে গিয়ে খ্যাতিমান ডাক্তারকে দেখায়। কুমুরডাঙ্গার রোগীদের আর্থিক বৈষম্য ডা. বোরহানউদ্দিনের চোখ এড়ায় নি। ধনী-দরিদ্র রোগীদের সমান হারে সে পায় না। রোগী না পাওয়ার অন্তর্নিহিত কারণ সে জানে। ফলে তার নদী ভরাট নিয়ে ব্যক্তিক উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নেই। কেননা কোন বিষয়ে মানুষের নিজস্ব লাভ-লোকসানের সম্ভাবনার ওপরই অনুভূতি-অনুভবের পরিবর্তন ঘটে। ডা. বোরহানউদ্দিন সম্পর্কে একজন সমালোচক বলেছেন, ‘চলমান ও পরিচিত জীবনপ্রবাহে সমর্পিত হয়ে মুক্তি-অন্বেষী, লোকজীবনেরই সে প্রতিনিধি, প্রতিভূ।’ কুমুরডাঙ্গার পরিস্থিতির ক্রমে অবনতি ঘটে। নদীপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কুমুরডাঙ্গাবাসীদের মধ্যে জাগে মহা দুশ্চিন্তা। ‘বাকাল নদীর মৃত্যুর সাথে কুমুরডাঙ্গার জীবনের উঠোনে ক্ষরা নামছে।’ সমস্যাগ্রস্ত মানুষেরা প্রতিনিয়ত প্রতীক্ষায় থাকে কবে আবার বাকাল নদীতে স্টীমার চালু হবে। নিত্য যোগাযোগ আর ব্যবসা-বাণিজ্যে বিরাট বিরূপ প্রভাব তাদেরকে বিচলিত করে তোলে গভীরভাবে। কেউ কেউ মনে করে, কোম্পানি স্টীমার মেরামতের জন্য নিয়েছে। মেরামত শেষ করে আবার স্টীমার চালু করবে। কেউ কেউ বলে, চড়ার কারণে স্টীমার ঘাটের স্থান পরিবর্তনের কথা, ঘাটটি সরিয়ে শহরের উত্তর পাশে নেওয়া হবে। নতুন স্থানে ঘাটটি সরিয়ে না নেওয়া পর্যন্ত স্টীমার চলাচল বন্ধ থাকবে। আবার অনেকে মনে করে, নদীর তলদেশ ভরে গেছে, তাতে স্টীমার চলাচল বন্ধ হলেও লঞ্চ চলাচল সম্ভব। তাই স্টীমারের পরিবর্তে বাকাল নদীতে লঞ্চ চলবে। স্টীমার পুনরায় চলাচল সম্পর্কিত এসব কথা ছিল ভিত্তিহীন। তাদের মুখে মুখে কানে কানে তৈরি হয়েছিল এসব জনশ্রুতি। কুমুরডাঙ্গার মানুষের একের প্রতি অপরের মমতাও কম নয়। স্টীমার বন্ধ হওয়ায় সমস্যাগ্রস্তদের অন্যতম হাবু মিঞা। তার বার বছর বয়সী মৃতপ্রায় ছেলেটিকে মহকুমা শহরের ভালো ডাক্তারের দ্বারা চিকিৎসা করানোর বিশেষ দরকার ছিল। কিন্তু স্টীমার বন্ধ হওয়ায় তা সম্ভব হয় নি। এই পরিস্থিতিতে সে রতনলাল মুহুরির ছেলের মুখে স্টীমার চলার খবর পায় ‘স্টীমার আজই আসবে’ বলে। হাবু মিঞাও আশায় ছিল স্টীমার চলাচলের। সে চমকিত হয়ে কান খাড়া করে স্টীমারের বাঁশির শব্দ শোনার চেষ্টা করে। সে যেন বাঁশির শব্দ শুনতে পায়। ক্রমশ শব্দটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তখনই সে ‘দৌড়ে বাড়ি গিয়ে ছেলেকে বুকে তুলে নিয়ে ঘাটে পৌঁছেছিলো’ হাতের ‘দলিলপত্র’ ফেলে দিয়ে। কিন্তু সে দিন স্টীমার ঘাটে আসে নি। ব্যর্থ মনে অসুস্থ সন্তানকে বুকে নিয়ে বাড়ি ফিরেছিল হাবু মিঞা। বস্তুত বাকাল নদী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নদী তীরবর্তী জনজীবনে বিরূপ প্রভাব পড়েছিল, নদীনির্ভর মানুষের জীবন যে প্রায় অচল হয়ে পড়েছিল হাবু মিঞার মাধ্যমে সে বিষয়টি এখানে উপস্থাপিত হয়েছে বাস্তবসম্মত ভাবে। নদীনির্ভর যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ হওয়ার কারণে তারা পড়ে গভীর সঙ্কটে। মহাকুমা শহরে পৌঁছাতে না পারলে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে বহির্বিশ্ব থেকে। কিন্তু স্থানীয়ভাবে তারা নৌকায়ই যাতায়াত করে। নৌকা যে তাদের জীবন ব্যবস্থার সঙ্গে কত গভীরভাবে সম্পৃক্ত, তা জানা যায় স্টীমার বন্ধ হওয়ার পর নদীর ঘাটে বিভিন্ন রকমের নৌকা দেখে। অসংখ্য মাঝি মানুষ ও মালামাল এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যাওয়ার জন্যে খেপ বাইতে এসেছিল। সে সমাজে ছিল তীব্র আর্থিক সমস্যা ; সে জন্যেই একটু সুযোগ পেয়ে তারা নৌকা নিয়ে স্টীমার ঘাটে এসেছিল অর্থ-উপার্জনের জন্যে। এই বাস্তব পরিস্থিতিতে বলা যায়, ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ গ্রামীণ অভিজ্ঞতার পটেই নির্মিত। এ প্রসঙ্গে উপন্যাসে আছে :

‘সে-সব নৌকা রাতারাতি চলে এসেছিল নদী পাড়ি দিয়ে, খালবিল অতিক্রম করে, পাল তুলে দাঁড় বেয়ে লগি ঠেলে। কত রকমের নৌকা : ছোট বড়, ঢঙের বেঢঙের, এমন নৌকা যা বিশ-চল্লিশজন সোয়ারি নিয়ে নির্ভয়ে পদ্মা-মেঘনা পার হয়ে যেতে পারে ঝড় তুফান উপেক্ষা করে, আবার তেমন নৌকাও যাতে খাল অতিক্রম করতে ভরসা হয় না ; কোন নৌকা হয়তো পানিতে কাৎ হয়ে ছিলো, তাকে তুলে তার গা-এ গাব ঘষে কোন প্রকারে ভাসিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে, আবার কোন নৌকা বেশ শক্ত মজবুত, আয়তনেও বড় কিন্তু যা ব্যবসাজীবন্ত লঞ্চ-স্টীমার- নৌকোয় সমাকীর্ণ জনসঙ্কুল কোন ঘাটে-গঞ্জে তীক্ষ্ণ প্রতিযোগিতার দরুণ নিস্ফল আশায়ই দিন কাটাতো। সক্ষম অক্ষম নৌকার মধ্যে আবার বেমানান নৌকাও কম ছিল না-যে-সব নৌকাদের লালসাই টেনে নিয়ে এসে থাকবে : ঘাস-নৌকার, কুমোর-নৌকা, জন্তুজানোয়ারের নৌকা। তাছাড়া দু-টি বজরাও এসে দলে যোগ দিয়েছিল যার একটিতে হয়তো অন্যকোন যুগে শৌখিন লোকেরা বাঈজি-গাইয়ে বন্ধু-বান্ধব নিয়ে আমোদবিহারে বের হতো। এখন তার রঙ নেই, খড়খড়ির অভাবে একটি জানলা খাঁ খাঁ করে, জোড়াতালি-দেয়া দেহটাও কেমন সৌষ্ঠবহীন। তবে অন্যটি ছোটখাটো ছিপছিপে, গায়ের রঙটাও তাজা। সেটি শ্রী-যৌবনের গরিমায় কিছুটা উদ্ধতভাবে অন্য বজরা থেকে দূরত্ব বজায় রেখে যাত্রীর জন্যে অপেক্ষা করে।’

কুমুরডাঙ্গার প্রতিনিধি উকিল কফিলউদ্দিন। বাকাল নদীতে স্টীমার চলাচল বন্ধ হওয়ায় সে জনগণের জন্যে যেমন বিচলিত হয়, তেমনি দুশ্চিন্তায় পড়ে নিজের কথা ভেবে। তারই নেতৃত্বে সরকারের কাছে দেওয়া হয়েছে প্রতিবাদপত্র। তারা আশা করে, যে কোন শনিবার নদীতে স্টীমার চলাচল শুরু করবে। শত শত কুমুরডাঙ্গাবাসীর সঙ্গে কফিলউদ্দিনও গভীর আগ্রহ ও বিশ্বাস নিয়ে অপেক্ষা করে স্টীমারের ; তাদের আশা আবার তাদের বাইরের বিশ্বের সঙ্গে গড়ে উঠবে যোগাযোগ। বহুবিধ সমস্যা ও সঙ্কট থেকে রেহাই পাবে তারা। উকিল কফিলউদ্দিনও যেতে পারবে মহকুমা শহরে কন্যা হোসনাকে দেখতে। আবার প্রতিষ্ঠা পাবে তার পিতৃস্নেহের অপার মহিমা। কিন্তু শনিবার শেষ হলেও ফিরে আসে নি স্টীমার। কয়েকদিন পরে স্টীমার ঘাটে এসেছিল একটি লঞ্চ। লঞ্চে এসেছিল স্টীমার কোম্পানির লোকেরা। তারা স্টীমার ভেড়ানোর পরিত্যাক্ত ঘাটটি সরিয়ে নিয়ে যায়। তাতে কুমুরডাঙ্গাবাসীদের পুনরায় স্টীমার চলাচলের স্বপ্ন ভাঙে। তারা ক্ষিপ্ত হয়ে ছুটে যায় বড় হাকিমের কাছে নালিশ করতে। স্টীমার কোম্পানির ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে অভিযোগের নেতৃত্ব দেওয়া উকিল কফিলউদ্দিনকে বড় হাকিম বাস্তব কথা বলেছিলেন :

“ফ্লাট ঘাটে দাঁড়িয়ে থাকলেই কী স্টীমার চলবে? নদী যদি ঠিক হয় তবে সব ফিরে আসবে। ঘাট ফিরে আসবে, স্টীমার ফিরে আসবে।”

বড় হাকিমের কথায় উকিলসহ উপস্থিত সকলের মনে নেমে আসে বিষাদ। তারা বুঝতে পারে সত্যিই বাকাল নদীর স্টীমার চলাচল বন্ধ হয়েছে। নদী মরে যাওয়ায় বেদনাহত মানুষেরা বলেছিল :

নদীটি যেন মানুষের মত মরতে বসেছে। একদিন তবে মানুষের মত তার যৌবন ছিল যে- যৌবন আর নেই। পরে প্রৌঢ় বয়সের স্থৈর্য-গাম্ভীর্যে প্রশান্ত হয়ে উঠেছিলো, এক সময়ে সেদিনেরও অবসান ঘটে। তারপর ধীরে-ধীরে বার্ধক্য ঘনিয়ে আসে দিনান্তের মত, এবং এবার তার আয়ু ফুরিয়ে এলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে ; মানুষের জীবনের মত নদীর জীবনও নশ্বর। সে-কথাই তাদের মন ভারি করে তোলে।

কেননা, ‘নদীটি হল প্রতিটি মানুষের সামগ্রিক সত্তার একত্রিত সহ-অবস্থানের যে সমাজ, তারই উত্থান-পতনের প্রতিনিধি।’ বাকাল নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে নদীর গভীরতা কমে, তাতে বন্ধ হয়ে যায় স্টীমার চলাচল। স্টীমার যোগাযোগ বন্ধ হওয়ায় সমগ্র জনজীবনে নেমে আসা দুর্বিপাকের, গভীর যন্ত্রণাবোধের প্রকাশ ঘটেছে যেন সকিনা খাতুনের শ্রæত কান্নার শব্দে এবং তা ব্যক্তির মনোলোক অতিক্রম করে ছড়িয়ে পড়ে গোষ্ঠীর মনোলোকে, জীবনলোকে। কুমুরডাঙ্গার নদীনির্ভর জনজীবনের মূঢ়, স¦ল্প শিক্ষিত ও সংস্কারাচ্ছন্ন শত শত মানুষ বিশ্বাস করতে পারে না যে, প্রকৃতিগত কারণেই বাকাল নদীর তলদেশ ভরাট হয়েছে। এই যুক্তিযুক্ত বাস্তব সত্যটির কাছে পরাজিত তারা। সকিনা খাতুন দরিদ্র মোক্তার মোসলেউদ্দিনের কন্যা। দারিদ্র্য তার জীবনে বাসা বেঁধেছে নিবিড়ভাবে। অর্থাভাবে অচলপ্রায় তার সংসার। তা ছাড়া মোসলেউদ্দিনের স্ত্রী রোগশয্যায়। এমন দুর্দিনে সকিনা খাতুন নিজের অজান্তেই সংসারের অনেক দায়িত্ব মাথায় তুলে নেয়, সংসারের সব কাজ-কর্ম করে। তা ছাড়া সে একটি মাইনর স্কুলের শিক্ষিকা। শিক্ষাকতা করে পাওয়া টাকাও সে তার বাবার সংসারের স্বাচ্ছন্দ্যের জন্যে ব্যয় করে। শত কাজের অবসরে সকিনা খাতুন অর্ধভঙ্গ ও কুঁজো হয়ে শুয়ে মাঝে-মধ্যে জন্ম-মৃত্যু, বেহেস্ত-দোযখ, চন্দ্র-সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্র, মানুষের ইহকাল-পরকাল নিয়ে ভাবতো। পরকালের অজানা জীবন নিয়ে ভাবতে গিয়ে সে ঘুমের মধ্যে মাঝে-মধ্যে অস্ফুট আর্তনাদ করে উঠত। এ জগতের কোন বিষয়ের প্রতি মোহ ছিল না তার। বাস্তবতার বিরুদ্ধ স্রোতে পড়ে সে তার সকল আকাক্সক্ষা অবদমিত করে হয়েছিল অন্তর্মুখী। এই সকিনা খাতুন শুনতে পায় একটি কান্নার শব্দ। তার হঠাৎ শুনতে পাওয়া কান্নার শব্দটি নারী কণ্ঠের যেন। সে বিচলিত হয়ে ওঠে। কান্নার শব্দ শুনতে পাওয়া প্রসঙ্গটি ক্রমে পৌঁছে যেতে থাকে কুমুরডাঙ্গার মানুষের কাছে। কুমুরডাঙ্গার মানুষেরা সকিনা সম্পর্কে তাদের ধারণা পাল্টে ফেলে। ‘দীর্ঘ বর্ণনায় সকিনা খাতুনের স্কুল অভিমুখী পদচারণার চিত্ররূপ … সেখানে একের পর এক মিছিল করে এসেছে কুমুরডাঙ্গার বিভিন্ন মানুষ, তাদের বিভিন্ন পেশা এবং মনোভাব নিয়ে- এ যেন তাদেরই লোভ, বৈরিতা, ক্ষমতা এবং অক্ষমতার এক নির্ভুল প্রতিচ্ছবি। বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষেরা জড় হয় সকিনা খাতুনকে উপলক্ষ করে। তার প্রতি আগ্রহ জন্মে কুমুরডাঙ্গার মানুষের। খয়রাত মৌলবী, গৃহবধূ তাহেরা, শিক্ষক সুলতান, মুদি দোকানদার ফনু মিঞা, কাপড়ের ব্যবসায়ী মোহনচাঁদ, সাইকেলের দোকানদার ছলিম মিঞা, হাসপাতালের কর্মচারী, পথের দু ধারের মানুষেরা, এমনকি, স্কুলের প্রধান শিক্ষয়িত্রীও সকিনা খাতুনের প্রতি দেখায় অন্য রকম মনোভাব। বিভিন্ন অবস্থান ও পেশার এ সব মানুষের উপস্থিতিতে বদলে যায় কুমুরডাঙ্গার মানুষের জীবনচিত্র। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে কুসংস্কার এভাবেই প্রভাব বিস্তার করে। সে কারণেই একজন সমালোচক বলেছেন, ‘‘কাঁদো নদী কাঁদো’ (১৯৬৮) উপন্যাসে গ্রাম বাংলার চিত্র অঙ্কিত’। বস্তুত, ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ উপন্যাসে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ সামাজিক প্রসঙ্গগুলোকে চিন্তার গভীরে নিয়ে গেছেন। সমাজের অভ্যন্তর থেকেই যেন উপস্থিত হয়েছে উকিল আফতাব খানের বাড়িতে আশ্রিত খয়রাত মৌলবী। সে সমাজে সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিরা বাড়িতে মৌলভী রাখত এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করতো। খয়রাত মৌলবী ‘যুবতী নারীর বেপর্দায়’ চলা ফেরা পছন্দ করতো না। কিন্তু আজ তার সে দৃষ্টিভঙ্গির দেয়াল ভেঙে গেছে। সে সকিনা খাতুনের দিকে তাকায় মুক্তভাবে। এ প্রসঙ্গে উপন্যাসে আছে :

‘সেদিন মনে হয় খয়রাত মৌলভী অবশেষে সকল উন্মুক্ত দৃষ্টিতে মেয়েটির প্রতি তাকাতে সক্ষম হয়েছে। তার মুখটা খুলে তাকালেও তার কণ্ঠস্বর হঠাৎ থেমে যায়; সে নিষ্পলকদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মেয়েটির দিকে।’

ধর্মীয় অনুশাসন মেনে পর্দানশীন হওয়ার যে রীতি প্রচলিত ছিল তা দেখা যায় কাছারির নাজির রহমত মিঞার পুত্রবধূ তাহেরার ক্ষেত্রেও। সে স্নেহশীলা পুত্রবধূ, সাংসারিক কাজকর্মের অবসরে স্বাধীনভাবে বাড়ির বাইরে যেতে পারে না, তার স্বামী লোখাপড়ার উদ্দেশ্যে অন্যত্র বাস করে। সাংসারিক এই পরিস্থিতিতে তাহেরার স্বাধীনভাবে চলা নারীদের প্রতি ছিল ‘ঈর্ষাজনিত কৌতূহলবোধ’। সে তাহেরাও সেদিন সকিনা খাতুনকে মনে করেছিল, ‘অকম্মাৎ যেন রহস্যময় হয়ে উঠেছে- যে রহস্য যুগপৎ আকর্ষণ করে।’ সকিনা খাতুন কুমুরডাঙ্গার জীবনপ্রবাহ প্রকাশিত হওয়ার ক্ষেত্রে সাহায্য করেছে তবারক ভুঁইঞাকে। সে সকিনা খাতুনের শুনতে পাওয়া কান্নার শব্দকে আশ্রয় করে, ‘একটি চলমান জীবনধারার বিচিত্র সব নর-নারীর বিচিত্র জীবন চরিত্র প্রকাশ করে গেছে এক এক করে। এইসব চরিত্রের সমাবেশে একটি সমাজের সামগ্রিক চিত্র ধীরে ধীরে উপন্যাসে প্রকাশ পেয়েছে।’

কুমুরডাঙ্গার হাইস্কুল সে জনপদের শিক্ষা বিস্তারের উল্লেখযোগ্য একটি প্রতিষ্ঠান। মাইনর স্কুলও সে ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রেখে চলেছে। কেননা অবস্থাগত ভাবে দুটি স্কুল কাছাকাছি অবস্থিত। একটি অঞ্চলের জনগণের শিক্ষা-দীক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে। কুমুরডাঙ্গার সমাজ গঠনের প্রতিনিধি হাই স্কুলের তরুণ শিক্ষক সুলতান। একপর্যায়ে সে সকিনা খাতুনের প্রতি আকর্ষণ বোধ করে।

ফনু মিয়ার মুদির দোকান, মোহনচাঁদের কাপড়ের দোকান, ছলিম মিঞার সাইকেলের দোকান, রুকনউদ্দিন শেখের ঔষধের দোকান ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী কেনাবেচার দোকানও গড়ে উঠেছে নির্দিষ্ট স্থানগুলোতে। সেখানে উদ্ভূত প্রতিকূল পরিস্থিতিতে জীবন যাপন করার জন্যে ব্যবহার্য সব ধরনের সামগ্রীর অভাবে ব্যাহত হয় সেখানকার জনজীবন। এ প্রসঙ্গে কুমুরডাঙ্গা ঘাটের বর্ণনা উপস্থাপন করা যায় :

‘সোজা পথটি যায় কাছারি-আদালতের দিকে। যেটি মোড় নেয় ডানদিকে নদীকে পশ্চাতে রেখে সেটি শহরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। সকিনা খাতুন দ্বিতীয় পথটি ধরে। সামনে দোকানপাট ; পথটি ক্ষুদ্র মফস্বল শহরের প্রধান ব্যবসাকেন্দ্রের মধ্য দিয়ে যায়। প্রথমে পড়ে সারিবাঁধা চার-পাঁচটি হোটেল যে-সব হোটেলে ব্যবসা-মামলা-মকদ্দমা-সংক্রান্ত ব্যাপারে কুমুরডাঙ্গায় এসে গ্রামবাসীরা দু-এক রাতের জন্যে মাথা গোঁজার ব্যবস্থা করে।

হোটেলগুলো আবাসিক। বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষেরা শহরে নানা কাজে আসে। কাজ সেরে বাড়ি ফেরত যেতে পারে না যারা, তারা রাতের জন্যে এসব হোটেলে থাকে। হোটেলগুলোর পরেই ফনু মিঞার মুদির দোকান। দোকানদার চাল ডাল ও অন্যান্য দ্রব্যসামগ্রী কেনা বেচার সুবাদে জেনে যায় ক্রেতাদের আর্থিক অবস্থা। ফনু মিঞা জানে সকিনার বাবার আর্থিক অবস্থা। ‘দেশের বাড়ির আত্মীয়-স্বজনের দাবি-দাওয়ায় সদা উত্ত্যক্ত অনেক সন্তান-সস্ততির বাপ মোক্তার মোছলেহউদ্দিনের আর্থিক অবস্থা আদৌ সচ্ছল নয়।’  এ পরিস্থিতিতে দোকানদার ফনু মিঞা সকিনার ‘মাজা-ভাঙ্গা’ ধরনের হাঁটা, তার শারীরিক অসুস্থতার কথাও ভুলে যায়। সে পাথর চোখে তাকিয়ে দেখে সকিনা খাতুনকে। 

ঔষধের দোকানদার রুকনদ্দিন শেখও সকিনা খাতুনকে দেখে। এলাকার একমাত্র ঔষধের দোকান এটি। নানা রঙের রহস্যময় পানিতে ভরা বড় বড় কতকগুলো কাচের পাত্র, ঔষধের শিশি-প্যাকেট ইত্যাদিতে সজ্জিত পুরানো কয়েকটা আলমারি, দেয়ালে বিভিন্ন ঔষধের বিজ্ঞাপন, এবং ‘একটি বিবর্ণ ঈষৎ ছেঁড়া বিজ্ঞাপনের স্বাস্থ্যোজ্জ্বল বিদেশিনী নারী দাঁত বের করে হাসছে আজ ক-বছর ধরে তার ইয়ত্তা নেই।’ মফস্বল শহরের একমাত্র ঔষধালয়ের এই অবস্থা। তবু এলাকার জনগণ এখান থেকেই কেনে ঔষধ। সকিনা খাতুনের মা এই দোকানের কম্পাউন্ডারের ঔষধ সেবনকারী। কম্পাউন্ডার সকিনা খাতুনকে দেখে মনে করে তার রোগী সকিনা খাতুনের মায়ের কথা। অনেক দিন ঔষধ খাওয়ানো হয় না তাকে, হয়তো রোগীর অবস্থা খারাপ হয়েছে। ভয়াবহ আর্থিক দুরবস্থার কারণে নিয়মিত ঔষধ কিনে খাওয়ার সামর্থ্য তাদের নেই। জীবন যাপনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাদের এমন অভাবও অসঙ্গতি বিরাজমান।

কুমুরডাঙ্গা উপশহরে কাপড়ের দোকানদার মোহনচাঁদ। সে অবাঙালি। তার পূর্বপুরুষ পশ্চিম থেকে এদেশে এসেছিল। প্রসঙ্গত বলা যায় ‘১৯৪৭-এর দেশ-বিভাগ থেকে শুরু করে সত্তর দশকের শেষ দিক পর্যন্ত বাংলাদেশের সমাজ বাস্তবতা’ এ উপন্যাসে প্রতিফলিত হয়েছে। সে সময় ভারত-পাকিস্তান থেকে অনেক মানুষই এদেশে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছিল। তারা এদেশেই রয়ে গেছে। ব্যবসায়ী মোহনচাঁদের পূর্বপুরুষেরা এদেশে নানা ব্যবসায়ে জড়িত ছিল। প্রথমে তারা গুড়ের ব্যবসা করত। কালক্রমে তারা থানকাপড়ের ব্যবসা শুরু করে। এ রকম আর একজন ব্যবসায়ী ছলিম মিঞা। সে সাইকেল ব্যবসায়ী। এই মফস্বল শহরে সাইকেলের একমাত্র দোকানদার সে। এই শহর থেকে বিভিন্ন স্থানে যাওয়ার অথবা এই শহরে আসার রাস্তাগুলো পাকা ছিল না। কাঁচা রাস্তার কারণে সাইকেলে যাতায়াতে খুব বেশি মানুষ আগ্রহী ছিল না। ফলে সাইকেল বিক্রি হতো খুবই কম। দোকানে রাখা সাইকেলগুলো ক্রেতার অভাবে প্রায় নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। একদিকে হয় না ভালো ব্যবসা, অন্যদিকে সাংসারিক নানা ঝামেলায় সলিম মিঞার মেজাজ সবসময় চড়া থাকতো। এই ছলিম মিঞাও সকিনা খাতুনের গোপন কান্না শোনার বিষয়ে উতলা হয়ে উঠেছিল। বাল্যকালে পিতৃহারা লোকটি বদমেজাজী হলেও মিথ্যুক-প্রতারক নয়। সে ছলচাতুরী বোঝে না। মনের কথা মুখে বলতে তার দ্বিধা নেই। সংসারের দারিদ্র্য ঘোচানোর জন্যে সে পৈতৃকসূত্রে পাওয়া বাড়ির পেছনের জমিতে নানা ফসলের চাষ করে। তাতে সাংসারিক অভাব অনেকটা পূরণ হয়। নানা জাতের ফলের চাষও করতো সে। আতাফল গাছ লাগিয়ে নিয়মিত পরিচর্যা করায় তা ভালো হয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে সে সংসার চালানোর জন্যে সাইকেলের দোকানে নানা ধরনের নাট-বল্টু বিক্রির ব্যবস্থাও করেছিল। নিত্য অভাব-তাড়িত দরিদ্র ছলিম মিঞার জীবনই কুমুরডাঙ্গার সাধারণ মানুষের জীবনচিত্রের প্রতিনিধিত্ব করে।

বাকাল নদীর তীরবর্তী জনপদের হাসপাতালের স্টাফরাও সকিনার প্রতি মুগ্ধ হয়। কুমুরডাঙ্গার মানুষের চিকিৎসার জন্য এটিই একমাত্র হাসপাতাল। এই হাসপাতালের কাছেই রয়েছে ‘দরিদ্র-পাড়া’ বলে একটি স্থান। সেখানে গরিব দিনমজুর, শ্রমিকেরা বসবাস করতো। তারাও কোন এক অজানা আকর্ষণে সকিনা খাতুনের দিকে তাকিয়ে দেখে। কুমুরডাঙ্গার মাইনর স্কুলের প্রধান শিক্ষয়েত্রীও সকিনা খাতুন প্রসঙ্গে তার মনোভাব বদলায়। তারা জানতে চায় কান্নার শব্দ সম্পর্কে। সকিনা খাতুনের শোনা কান্নার শব্দ নিয়ে কুমুরডাঙ্গার মানুষেরা বিচলিত-চিন্তিত। রাস্তায়-ঘাটে, বাজারে-বন্দরে, দোকানে-হাসপাতালে, শিক্ষক, উকিল, মোক্তার, ডাক্তার, মুহুরী, দোকানদার সকলেই বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল। এতদিন পর সে কান্নার শব্দ সকিনা খাতুনকে ছাড়িয়ে পৌঁছে যায় কুমুরডাঙ্গার অন্যান্য মানুষের কানে। তারাও শুনতে পায় কান্নার শব্দ। মোহনচাঁদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী মিহির মন্ডল, সে সৎ এবং সাবধান লোক। তার শোনা কান্নাকে মোহনচাঁদ ভাবে গভীর রাতে নৌকায় চলে যাওয়া কোন দুঃখী নারীর কান্না। দিনের পর দিন কেউ না কেউ সে কান্নার শব্দ শুনতে পায়। রহস্যাবৃত কান্নার শব্দে তারা কৌতূহলী হয়ে ওঠে। পক্ষাঘাতগ্রস্ত অশীতিপর বৃদ্ধ ঈমান মিঞাও শোনে সে কান্নার শব্দ। ঔষধের দোকানদার রুকনুদ্দিনের স্ত্রী, ফনু মিঞা, মুহুরি হবু মিঞার স্ত্রী জয়তুনবিবি, মধ্য বয়সী উকিল সুরত মিঞা, ডাক্তার বোরহানউদ্দিন, তবারক ভুঁইঞার স্ত্রী আমিরুন সকলেই শুনেছিল সে কান্নার শব্দ, তা যেন ‘ব্যক্তির অবচেতনকে ছাড়িয়ে গোষ্ঠীর মনোলোক এবং অবচেতনলোকের রহস্যকে স্পর্শ করে।’ এ প্রসঙ্গে একজন সমালোচকের মন্তব্য, ‘ব্যক্তি ও জনগোষ্ঠীর মনের অবচেতনা ও অর্ধচেতনায় এই বিশ্বাস ও ভীতির অবস্থান মানব সভ্যতার আদিকাল থেকে চলে আসছে। আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশ হওয়া সত্তে¡ও আদিম ভীতি ও বিশ্বাস মনের গভীর তলদেশ থেকে সম্পূর্ণ উৎখাত করা সম্ভব হয়নি।

এক পর্যায়ে বাকাল নদীর তীরবর্তী কুমুরডাঙ্গার মফস্বল শহরের স্টীমার ঘাটের প্লাটফর্মটিও চলে যায়। তাতে প্রচন্ড প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় উকিল কফিলউদ্দিনের মনে। বয়স্ক মানুষটির চোখে-মুখে ফুটে ওঠে পরাজয়ের চিহ্ন। কান্নার শব্দটি স্টীমার কোম্পানি কোন না কোন ভাবে প্রচার করছে। তারা যে কোন উপায়ে কুমুরডাঙ্গার মানুষদের বিশ্বাস করাবে বাকাল নদী ভরাট হওয়ার কথা। নদী ভরাটের কথা জনগণকে বিশ্বাস করাতে পারলেই তারা সহজে অন্যপথে স্টীমার চালাতে পারবে। কফিলউদ্দিন এ প্রসঙ্গে বার লাইব্রেরিতে বলে, “ওদেরই কাজ হবে। তারা হাড়ে-হাড়ে শয়তান, নেমকহারামের দল।’’

কান্নার শব্দ শোনার বিষয়টি কুমুরডাঙ্গা প্রশাসনেও সৃষ্টি করে আলোড়ন। প্রশাসনের লোকেরা স্টীমার কোম্পানির কোন কারসাজি কি না তা খতিয়ে দেখে। দারোগা সাহেবের নেতৃত্বে একদল মানুষ শহরের অলিগলি খুঁজেছে। কোথাও কোন আলামত পায় নি যে আলামতের ভিত্তিতে অভিযুক্ত করা যায় স্টীমার কোম্পানিকে। সাধারণ জনগণের মতো শহরের মোল্লা মৌলবীরাও শ্রুতি কান্নার শব্দ প্রসঙ্গে বিচলিত হয়ে ওঠে। তারা মনে করে, ‘কান্নাটি শয়তানের কারসাজি হবে : শয়তান বহুরূপী।’ মোল্লা-মৌলবীরা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে শয়তান তাড়ানোর পদক্ষেপ নিয়েছিল, যা আবহমান কাল থেকে বাঙালি মুসলমান সমাজে প্রচলিত। তারা শহরের বিভিন্ন স্থানে আজান দেওয়ার ব্যবস্থা করে। যাতে করে আজানের শব্দ শহরের সব স্থানেই পৌঁছে যায়। কেননা আজানের শব্দ শয়তানের কানে গেলে শয়তান আর সে স্থানে থাকে না বলে ধারণা করা হয়। তা ছাড়া মৌলবীরা মিলাদ পড়িয়ে দোয়া-দরুদ পড়ে ছদকা-শিরনী দেওয়ার ব্যবস্থা করে। এমন কি তারা একদিন গভীর রাত পর্যন্ত মসজিদে বিশেষ নামাজেরও আয়োজন করে। সেদিন নামাজে শরীক হয়েছিল অসংখ্য লোক, কেননা তারা মনে করতো, তাতে বিচিত্র কান্নার শব্দটি বন্ধ হবে। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটে নি ; কান্নার শব্দ বন্ধ হয় নি। বরং নামাজে মগ্ন লোকেরাও শুনেছিল সে কান্নার শব্দ। বিস্ময়-বিমূঢ় একজন নামাজী বলেছিল, ‘এত মানুষের কণ্ঠধ্বনিও সে-আওয়াজ ঢেকে রাখতে পারে নি।’ মৌলবীরাও কান্নার রহস্য উদ্ঘাটনে ব্যর্থ হয়। এবং বাস্তবে শয়তানের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। তবু গ্রামীণ জীবনে অতীতকাল থেকে চলতে থাকা এসব সংস্কার যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে।

কুমুরডাঙ্গায় অদৃশ্য কান্নার শব্দ নিয়ে সৃষ্টি হয় এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতি। তা যেন রূপ নেয়, ‘এক অতিপ্রাকৃত বিশ্বাস বা সংস্কারের। অর্থাৎ ব্যক্তির মনোলোকের রহাস্যাবৃত নির্দিষ্ট কোনো অন্ধ ধারণা ধীরে ধীরে আচ্ছন্ন করে ফেলছে সমগ্র জনগোষ্ঠীর জীবন ও জগত।’ তারা হয়ে ওঠে ভীত, সযত্নে এড়াতে চায় কান্নার শব্দ। কান্নার প্রসঙ্গ নিয়ে কুমুরডাঙ্গার মানুষের মধ্যে নানা স্থানে নানা আলোচনা হয়। এ নিয়ে কথা হয় আদালত পাড়ায়ও। আদালত পাড়ায় মামলা মকদ্দমায় জড়িতদের উপস্থিতিতে জটলা হয় প্রায় সব সময়ই। সেখানে অশত্থ গাছের ছায়ায় রয়েছে চায়ের দোকান। চা-পান-সিগারেট এ সব ছোটখাটো দোকানের বেচাকেনার প্রধান সামগ্রী। মামলা-মকদ্দমায় জড়িত হয়ে এখানে উপস্থিত হওয়া ব্যক্তিরা এসব দোকান থেকে চা-পান-সিগারেট কেনে। তারা সেখানে নানা বিষয়ে আলাপ জমায়। আদালত পাড়ার এ ধরনের চিত্র আজও বর্তমান। আদালত পাড়ায় মামলা-মকদ্দমার সঙ্গে জড়িত থাকে বহু লোক। তারা মামলা-সংশ্লিষ্ট কাজ করে, এবং সে কাজকে তারা তাদের পেশা হিসেবেই মনে করে। অনেকে মামলা-মকদ্দমাকে কেন্দ্র করে টাউটগিরিও করে। কুমুরডাঙ্গার আদালত পাড়ায় এমনই একজন লোক মনিরুদ্দিন, তাকে সবাই ‘টাউট মনিরুদ্দিন’ বলেই জানে। লোকটি টাউটগিরি করলেও ধর্মে-কর্মে নিয়মিত। সে বলে, ‘“মোক্তার মোসলেহউদ্দিনের মেয়ে ঠিকই বলে। কে আর কাঁদবে, নদীই কাঁদে, নদী মরতে বসেছে না ?’’ তার কথায় যেন কুমুরডাঙ্গার মানুষেরা পেয়ে গেছে কান্না প্রসঙ্গে সৃষ্ট আতঙ্কের উত্তর। এ প্রসঙ্গে আসে দর্জি করিম বক্সের কথা। কুমুরডাঙ্গায় দর্জির কাজ একটি উল্লেখযোগ্য পেশা হলেও সে পেশায় তেমন জৌলুশ নেই। তবু সংসারে একটি পেশায় জড়িয়ে থাকতে হয় বলেই তারা দর্জি কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। দর্জি করিম বক্সের মাধ্যমেও কান্না প্রসঙ্গিত ভয়ের উদ্রেক কমে এবং তা উন্নীত হয় মঙ্গলময় প্রতীকে। দর্জি করিম বক্সের কথা :

…তার মনে হয় কোথাও যেন একটি বাণবিদ্ধ পাখি তীক্ষèস্বরে আর্তনাদ করছে। সেলাই-কাজ বন্ধ করে সে মনোযোগ দিয়ে শোনে, কারণ আওয়াজটি যে পাখির আর্তনাদ নয় তা বুঝতে তার দেরি হয় না। আওয়াজটি অবশেষে থামে, আহত পাখিটি যেন ডানা মেলে উড়ে গিয়ে দূর আকাশে চলে যায়। তার রেশটি কানের মধ্যে মিলিয়ে গিয়েছে কি অমনি অত্যাশ্চর্য ধরনের অনুভূতিতে দর্জি করিম বক্সের মনপ্রাণ-আপ্লুত হয়ে পড়ে। তার মনে হয়, দীর্ঘদিনের নিবর্ষণের ফলে শুষ্ক উত্তপ্ত হয়ে-ওঠা জমির মতো প্রাণে স্নিগ্ধশীতল পানি এসে পৌঁছেছে যে-পানি ধীরে-ধীরে সমগ্র অন্তরে প্রবাহিত হয়ে তৃষ্ণা তো দূর করছেই, সমস্ত ময়লা-অবর্জনাও ধুয়ে নিয়ে যাচ্ছে, নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে কুচিন্তা হিংসাবিদ্বেষ ক্ষোভদুঃখ আফসোস।

উকিল কফিলউদ্দিন কুমুরডাঙ্গা মফস্বল শহরের প্রথম সারির মানুষ। তার নেতৃত্বে কুমুরডাঙ্গা ছোঁয়া পেয়েছে আধুনিকতার। নিজ উদ্যোগে সে কুমুরডাঙ্গাকে গড়ে তুলেছে। নিজের অর্থ, শ্রম, সময়, সবই সে ব্যয় করেছে এ জন্যে যার ফলে কুমুরডাঙ্গায় গড়ে উঠেছে সব রকমের সামাজিক প্রতিষ্ঠান। ‘উপন্যাসে ওয়ালীউল্লাহ্ ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা থেকে ক্রমশ সমষ্টিকেন্দ্রিকতায় পৌঁছেছেন।’ এখানের মানুষেরা ধর্ম-কর্মে খুবই আন্তরিক, সবকিছুর মূলেই ক্রিয়াশীল তাদের ধর্ম বিশ্বাস। এ কারণে, উকিল কফিলউদ্দিন সে সমাজের মানুষের মানসিক চাহিদার কথা বিবেচনা করেই যেন তৈরি করেছে গম্বুজশোভিত মসজিদ। মেয়েদের মাইনর স্কুল ও কাছারি আদালতের সামনে ক্লাবঘর তৈরি করে খেলাধূলাসহ নানা সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড করার ব্যবস্থাও সে করেছে। পত্র-পত্রিকা পড়ে দেশ বিদেশের খবরাখবর পাওয়ার ব্যবস্থাসহ নানা ভাবে জ্ঞান চর্চার জন্যে তিনি ছিলেন সদা সচেষ্ট। খেলাধূলার প্রতি গভীর আগ্রহের জন্যে একজন স্থানীয় মৃত ব্যক্তির নামে মরহুম ওয়ালেদ ফুটবল টুর্নামেন্ট চালু করেছিল কফিলউদ্দিন। ফুটবল খেলার সে প্রতিযোগিতায় সারা কুমুরডাঙ্গা জুড়ে অনন্দের ঢেউ খেলে যেত। শুধু তাই নয়, উকিল কফিলউদ্দিন কুমুুরডাঙ্গার গবাদি পশু সম্পদ রক্ষার তাগিদ অনুভব করেছিল। সে সরকারের কাছে জোর দাবি জানিয়ে গবাদিপশুর চিকিৎসার জন্যে প্রয়োজনীয় ডাক্তার আনার ব্যবস্থা করেছিল। উকিল কফিলউদ্দিন ছিল সমাজ সচেতন, তার দৃষ্টি সমাজের সব দিকেই পড়তো। তার কারণে কুমুরডাঙ্গায় চাকরিরত দারোগা, ডাক্তার, হাকিম, মুন্সেফ কেউ-ই কোন রকম উৎকোচ গ্রহণ করতে পারতো না। স্টিমার চলাচল বন্ধ হওয়ার পর কুমুরডাঙ্গার শহরের অবনতি কফিলউদ্দিনের চোখে ধরা পড়ে ; সে ভাবে ‘মধ্যযুগে প্রত্যাবর্তন’ করা শহরে সে আর বসবাস করবে না। মহকুমা শহরে মেয়ে হোসনার কাছে গিয়ে নতুন করে গড়ে তুলবে সে নিজের নতুন অবস্থান। অবশ্য কুমুরডাঙ্গা ছেড়ে যাওয়ার ভাবনায় বেদনায় তার হৃদয় ছটফট করে ওঠে। ‘একবার বিষন্ন ভাবটি এমন ঘনীভূত হয়ে ওঠে যে তার মনে হয় জীবিত অবস্থাতেই সে যেন তার মৃত্যুশোকে সমাকুল হয়ে পড়েছে।’ তবু সে বেদনা আড়াল করে, সকলের কাছে বিদায় নেয়। নিজের মনকে সান্ত¦না দেয় নদীতীরে বসবাসকারী মানুষের সঙ্গে তুলনা করে। নদীর তীরে ঘরবাড়ি তৈরি করে বসবাস করতে না করতেই তারা ঘরবাড়ি হারায় প্রমত্ত নদীর গর্ভে। গৃহহারা নদীভাঙা সেই মানুষেরা নতুন করে আবার খুঁজে নেয় নতুন আবাস। নদীসিকস্তি মানুষের কথা ভেবে নিজের মনকে প্রবোধ দিয়ে বজরায় উঠতে গিয়ে আর উঠতে পারে নি উকিল কফিলউদ্দিন। নদীতীরেই নিস্তেজ হয়ে মৃত্যুবরণ কওে সে। এ বিষয়ে উপন্যাসে আছে :

উকিল কফিলউদ্দিন বজরায় উঠতে যাবে এমন সময়ে সর্পদষ্ট মানুষের মত পা তুলে নেয় সে। কিছুক্ষণ সে বিমূঢ় হয়ে থেকে এদিক-ওদিক তাকায় যেন কোথাও কিছু সন্ধান করে, তারপর কেমন স্তব্ধ নিথর হয়ে পড়ে। এবার ঘাটের সমবেত লোকেদের মনে হয়, নদীর দিকে তাকিয়ে সে যেন কি শুনছে। ক্রমশ তার চোখ বিষ্ফোরিত হয়ে ওঠে, তারপর সমস্ত মুখ রক্তশূন্য হয়ে পড়ে। অবশেষে অদৃশ্য কোন হিংস্র জন্তুর হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্যেই যেন আবার ক্ষিপ্রভঙ্গিতে বজরায় ওঠবার চেষ্টা করে, কিন্তু এক পা মাত্র উঠিয়ে সহসা বেসামাল হয়ে ধরাশায়ী হয়-দেহের অর্ধেক পানিতে অর্ধেক জমিতে। কেউ যখন তাকে তুলবার চেষ্টা করে তখন উকিল কফিলউদ্দিনের ধড়ে আর প্রাণ নেই।

উকিল কফিলউদ্দিনের অকাল মৃত্যুতে কুমুরডাঙ্গার মানুষেরা হতবিহŸল হয়ে পড়ে। কাছারি-আদালত ও বিভিন্ন দোকানের সামনে জড়ো হওয়া লোকজনের মধ্যে, রাস্তার দু ধারের বাড়িতে বাড়িতে চলে এ মৃত্যু নিয়ে আলোচনা। ডাক্তারি জ্ঞান মতে ডাক্তার বোরহানউদ্দিন বলেছিলো, হৃদপিন্ডের কাজ বন্ধ হওয়া তার মৃত্যুর কারণ। কিন্তু কুমুরডাঙ্গার অনেক লোকই ডাক্তারের দেওয়া মৃত্যুর কারণ মেনে নেয় নি। তারা মনে করে অন্য কিছু :

উকিল কফিলউদ্দিন বিচিত্র কান্নাটি শুনতে পেয়েছিল বলেই সর্পদষ্ট মানুষের মত বজরা থেকে পা তুলে নিয়েছিল, সে জন্যেই তার চোখ বিস্ফারিত এবং মুখ রক্তশূন্য হয়ে পড়েছিল- সে-বিষয়ে নিঃসন্দেহ হলে কুমুরডাঙ্গার অধিবাসীদের মনে পূর্বের আশঙ্কাটি ফিরে আসে, কি একটা কথা অস্পষ্টভাবে মনের প্রান্তে ঘোরাঘুরি করতে শুরু করে।

উকিল কফিলউদ্দিনের মৃত্যু সম্পর্কিত ধারণা তাদেরকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে দেয়। গভীর চিন্তামগ্ন হয় হবু মিঞা। সে তার শিশু-পুত্রের অকাল মৃত্যুর কথাও ভুলে যায়। তার মধ্যে ধারণা জন্মে, কুমুরডাঙ্গায় নামবে মহাপ্রলয়। তারই নমুনা উকিল কফিলউদ্দিনের অকাল মৃত্যু। মহাপ্রলয় বলতে, মহামারী, মহাপ্লাবন, বা অকস্মাৎ ভূমিকম্প যাতে করে কুমুরডাঙ্গার মানুষ পড়বে ঘোর সঙ্কটে। সে ধ্বংসযজ্ঞের কথা ভাবতে ভাবতে কুমুরডাঙ্গার মানুষের চেতনা হয়ে যায় নিস্পৃহ। তারা মহাপ্রলয়ের ইঙ্গিত বহন করা কান্নার শব্দ শুনতে চায় না কোন মতে, তারা তা এড়িয়ে চলতে চায় যত্ন সহকারে। কমুরডাঙ্গার মানুষের মনের এই পরিস্থিতির বাইরে যায় না দর্জিপাড়ার রহমত শেখও। সে হতবিহ্বল হয়ে পড়ে, নিতান্ত ব্যক্তিগত চিন্তায় ভেঙে পড়ে। তার জীবনের বেশিরভাগ সময় কেটেছে কষ্টে। দীর্ঘদিন অর্থকষ্টে ভোগার পর সে আদালত পাড়ায় একটি পান-বিড়ির দোকান করেছিল। এই দোকান চালিয়ে সে তার জীবনের দুঃখ-কষ্ট অনেকটা লাঘব করতে পেরেছিল। অতীতের সীমাহীন দুঃখ- বেদনার কথা মনে করে সে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। কেননা কুমুরডাঙ্গায় মহাসঙ্কট ঘটলে তার দোকানটি হবে হাতছাড়া। এই ভাবনায় পাগলপ্রায় রহমত শেখ কোন ভাবেই চায় না কুমুরডাঙ্গায় হোক কোনরূপ অঘটন। দোকানটি হারিয়ে সে অতীতের সীমাহীন অভাব-অভিযোগের জীবনে ফিরে যেতে চায় না। তাই নিজ ভাবনায় আত্মমগ্ন রহমত নিজেকে রক্ষার জন্যে একটি পশু উৎসর্গ করে বাকাল নদীতে। এ প্রসঙ্গে উপন্যাসে আছে :

প্রথমে সে ধারালো ছুরি দিয়ে বাছুরটির গলা কাটে, ফিনকি দিয়ে তাজা উষ্ণ রক্ত উঠে তার দেহ এবং বস্ত্রের খানিকটা রঞ্জিত করে, যার উগ্র রঙের তুলনায় সন্ধ্যাকাশের রক্তিমাভা ফিকা-পানসে মনে হয়। তারপর রহমত শেখ রক্তাক্ত, মস্তকছিন্নপ্রায় বাছুরটি আবার বুকে জড়িয়ে ধরে তীর বেয়ে নিচে নেবে যায়, চোখে-মুখে নিথর ভাব। পানিতে নেবে সে হাঁটতে থাকে ; হাঁটু, কোমর তারপর বুক পর্যন্ত সে-পানি উঠে আসে। এবার সে বাছুরটিকে শ্লথগতি স্রোতে ছেড়ে দেয়, চতুর্দিকে নদীর পানি গাঢ় হয়ে ওঠে।

বাকাল নদীতে পশু উৎসর্গের মধ্যে মঙ্গল চিন্তার কথা কুমুরডাঙ্গার জনগণও বুঝতে পারে এক সময়। তখন তারাও সকলে মিলে রহমত শেখের মতো নদীকে খুশী করার জন্যে বিভিন্ন সামগ্রী নদীর বুকে বিসর্জন দেয়। হাড়ি-পাতিল, জামা-কাপড়, চাল-ডাল, সোনা-রূপাও ছিল তাদের বিসর্জনের তালিকায়। এ বিষয়ে উপন্যাস থেকে উল্লেখ করা যায় :

দলে-দলে তারা নদীর তীরে উপস্থিত হতে শুরু করে, হাতে এটা-সেটা। যে যা পারে, যা যার কাছে মূল্যবান মনে হয়, তাই নিয়ে আসে : হাড়ি-পাতিল, জামা-কাপড়, চাল-ডাল, টাকা-পয়সা, এমনকি সোনা-রূপার গহনাও। এ-সব তারা নদীর পানিতে ছুঁড়তে থাকে।

রহমত শেখের মত ক্ষুদ্র ব্যবসা করেই জীবিকা নির্বাহের লোক কুমুরডাঙ্গায় বেশি। তারা পান-বিড়ি বিক্রির মতো ক্ষুদ্র ব্যবসাকেই-মনে করে জীবনের সর্বস্ব। অনেক কিছুর বিনিময়ে হলেও তারা তা রক্ষা করতে চেষ্টা করে। তাই নিজেদের মঙ্গল কামনায় বাকাল নদীতে দ্রব্য-সামগ্রী উৎসর্গ করার পর কুমুরডাঙ্গার অধিবাসীদের মধ্যে অনেকটা স্বস্তি নেমে আসে। তারা মনে করে যেন বন্ধ হয়েছে মহাপ্রলয়ের আশঙ্কা। মহাপ্রলয়ের আশঙ্কা মুক্ত হলেও তারা পায় না কোন নতুন সুপথের সন্ধান। এ সময় তাদের সুপথ দেখায় অবসর পাওয়া স্টীমার ঘাটের স্টেশন মাস্টার খতিব মিয়া। কোম্পানি থেকে পাওয়া টাকা দিয়ে সে অবসর জীবনকে সুন্দর করে গুছিয়ে নেবে বলে পরিকল্পনা করে। চাকুরির কারণে খতিব মিয়া দীর্ঘদিন নিজ বাড়ির বাইরে অবস্থান করেছিল। ফলে গ্রামের বাড়ির সঙ্গে সৃষ্টি হয়েছিল দূরত্ব। এমন কি তার পৈত্রিক সম্পত্তিও অন্যান্য ভাইয়েরা দখল করে নিয়েছিল। তার ভাইয়েরা দরিদ্র। তাদের প্রতি সহানুভূতির কারণে খতিব মিঞা তার পৈত্রিক সম্পত্তি অধিকারে আনতে পারে নি। তা ছাড়া বাড়ির অনুন্নত-অশিক্ষিত পরিবেশে খতিব মিঞা ফিরে যাওয়ার সাহস করে নি। আধুনিক নাগরিক জীবনের সুবিধা গ্রামে-গঞ্জে পাওয়ার উপায় নেই। সেটা খতিব মিঞা আরও স্পষ্ট বুঝেছিল তার মায়ের মৃত্যুতে বাড়ি গিয়ে। সে ভেবেছিল অন্যত্র জমি কিনে বাড়ি তৈরি করবে। সে জন্যে স্থান ঠিক করেছিল কুমুরডাঙ্গার আশে-পাশে কোথাও। বিগত পাঁচ বছর এ অঞ্চলে বসবাসের কারণে তার ‘মন পড়ে গিয়েছে’ কুমুরডাঙ্গায়। তার দৃষ্টি পড়েছে কুমুরডাঙ্গার মাটিতে। সেখানে যে কোন ফসল চাষ করা সম্ভব। সে অঞ্চলের মাটির প্রতি তার জন্মে অগাধ মমতা-আস্থা। সে ভাবে মৃত্যুর পরও এমন সোনাফলা মাটিতে সমাহিত হওয়া ‘সৌভাগ্যের কথা’। তাতে মৃত্যু প্রসঙ্গেও সে ভয় মুক্ত হয়। খতিব মিঞার মতো এমন জীবনবাদী কথা কুমুরডাঙ্গা সম্পর্কে কেউ কোনদিন বলে নি। ‘খতিব মিঞা উত্তীর্ণ হয়েছে পরম নির্ভীক সত্তার শুদ্ধ জাগর চৈতন্যে।’ খতিব মিঞার কথাগুলো তাই দ্রুত ছড়িয়ে যায় কুমুরডাঙ্গায়। সেখানকার মানুষেরাও অনুপ্রাণিত হয় আশাবাদে। তাদের প্রাণে সঞ্চার হয় আশার আলো। মনের নিরানন্দ দূর করে তারা মিলিত হয় আনন্দ-মোহনায়। খতিব মিঞা প্রসঙ্গে তাই বলা যায়, ‘বহমান জীবনস্রোতের সঙ্গে শিকড়ায়িত হয়েই খতিব মিঞা খুঁজে পেয়েছে তার জীবনের পরমার্থ, বেঁচে থাকার অনিবার্য প্রেরণা।’ ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ উপন্যাসে লেখক নদীর কান্নার কথা বলেছেন ; আসলে নদী কাঁদে না, তা মানুষের কল্পনা। কাঁদে মানুষ মানুষের জন্যে। ‘বাকাল নদী যে কুমুরডাঙ্গার মানুষের জন্যে কাঁদে তা মানুষের এবং তা সমাজবদ্ধ মানুষের ক্রন্দনের কোরাস। ওয়ালীউল্লাহ্ যেন উপন্যাসটির শেষ বাক্য, যা এই উপন্যাসের নাম সরবরাহ করেছে, লেখেন-‘কাঁদো নদী, কাঁদো’ যেন একটি মিনতি তিনি করেন, মানুষ তুমি মানুষের জন্যেই কাঁদো।’ সঙ্গত কারণেই বলা যায়, ‘সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র উপন্যাস আমাদের নিয়ে যায় অস্তিত্বের প্রগাঢ় অন্ধকার থেকে আলোর দিকে, বিমিশ্র সত্তা থেকে শুদ্ধ সত্তার অভিমুখে।’

‘কাঁদো নদী কাঁদো’ উপন্যাসের কাহিনী একদিকে চাঁদবরণঘাটের পার্শ্ববর্তী গ্রাম-সমাজের পটভূমিতে, অন্যদিকে বাকাল নদী ও তার তীরবর্তী কুমুরডাঙ্গা উপশহরের জনমানুষের জীবনের আশা, সংগ্রাম, সুখ-দুঃখকে কেন্দ্র করে উপস্থাপিত। উপন্যাসটির কেন্দ্রীয় ব্যক্তি মুহাম্মদ মুস্তফাকে উপলক্ষ করে লেখক সচেতনভাবে তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নির্মাণ করেছেন। তাকে নির্মাণ করতে গিয়ে ঔপন্যাসিক আশ্রয় নিয়েছেন একজন কথকের। কথক-১ মুহাম্মদ মুস্তফার জীবন ইতিহাসের বিবরণদাতা। তার বক্তব্য, ‘লোকটির কথা মন দিয়ে শুনছিলাম। একবার মনে হয়, তার কথা আমার স্মৃতির পর্দায় কোথায় যেন ঈষৎ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।’ ‘লোকটি’ অন্য একজন কথক, বা কথক-২। সেও স্টীমার যাত্রী, স্টীমারের ডেকে বসে বলছিল কুমুরডাঙ্গার গল্প। কুমুরডাঙ্গা উপশহরের নাম শুনে বিচলিত হয়েছিল কথক-১। তার স্মৃতিতে জেগে উঠেছিল একটি অতীত এবং কথক-১ কথক-২কে ভেবেছিল তবারক ভুঁইঞা। কেননা তার সঙ্গে কুমুরডাঙ্গার ছোট হাকিম মুহাম্মদ মুস্তফার গভীর সম্পর্ক ছিল। সে কারণে কথক-১ মনে মনে ভেবেছিল, মুহাম্মদ মুস্তফা সম্পর্কে কথক-২ অনেক কিছু জানে। কথক-১ তবারক ভুঁইঞার কথা শুনতে শুনতে স্মৃতিচারণ করে এবং সে স্মৃতিচারণের মাধ্যমেই উপস্থাপিত হয় মুহাম্মদ মুস্তফার জীবনের ইতিহাস এবং চাঁদবরণঘাট ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মানুষের জীবনচিত্র।

কুমুরডাঙ্গার ছোট হাকিম মুহাম্মদ মুস্তফা সম্পর্কে কথক-১ বলেছে, ‘সে আমার চাচাত ভাই’। সে জানে মুহাম্মদ মুস্তফার বাল্য, কৈশোর, শিক্ষাজীবন, চাকরিজীবন ও খোদেজা প্রসঙ্গ। শুধু মুহাম্মদ মুস্তফার জীবন কাহিনীই নয়, কথক-১ এর আত্মকথনে জানা যায় মুহাম্মদ মুস্তফার চাচা বদর শেখ, পিতা খেদমতুল্লাহর জীবন কাহিনীও। তাদের জীবনের ঘটনাবলি চাঁদবরণঘাটের পার্শ্ববর্তী জনজীবনেরই ছবি। বদর শেখের বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমে জানা যায় তাদের কৃষিনির্ভর জীবন ব্যবস্থার কথা। সে অঞ্চলের মানুষেরা চাষাবাদ করে জীবন যাপন করতো। সেখানের জমি খুব উর্বর। তারা জমিতে চাষ করে বোরো ধান, এছাড়াও রবি শস্যের মধ্যে, খেসারি, কলাই, সরষে ইত্যাদি। শুধু জমিতে ধান আর রবি শস্য চাষের মধ্যেই তাদের চাষাবাদ থেমে থাকে না। তারা বাড়ির আসে পাশে নানা জাতের ফল ও সবজি চাষ করে। দেখা যায় ঘরের চালেও তারা কুমড়া গাছের লতা তুলে দেয়। তাতে রূপালি রঙের চাল কুমড়া ধরে, তা মানুষের দৃষ্টি কাড়ে। নানা রকম ফসল ফলিয়ে তারা ভালোভাবেই জীবন চালায়। কিন্তু বদর শেখের ক্ষেত্রে ঘটেছে বিপরীত। সে অলস প্রকৃতির লোক। পৈত্রিকসূূত্রে পাওয়া জমিই তার একমাত্র মূলধন। সে জমিতেও সে নিয়মিত ফসল ফলায় না, শুধু বোরো ধানের ওপরেই নির্ভর করে। চাষ করত না কোন প্রকার রবিশস্য। বাড়ির আশে-পাশেও সে রোপন করত না কোন গাছের চারা। এসব কারণে বদর শেখের সংসারের অভাব কমত না। এ পর্যায়ে তার অভাব তীব্ররূপ ধারণ করেছিল। অভাবের কারণে সে শিশুপুত্রের জন্যে ঈদ উপলক্ষে নতুন কাপড়ও কিনতে পারে নি। সে সমাজে ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনের রেওয়াজ ছিল। বদর শেখের অলসতার কারণেই তার ছেলে-মেয়েরা ঈদ উৎসবের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হতো। এর মধ্যেই বদর শেখ অবিবেচকের মত দ্বিতীয় বিয়ে করে। দ্বিতীয় স্ত্রী রোগা, সে সংসারে আসার পর বদর শেখের আর্থিক অবস্থার অবনতি ঘটে আরও দ্রুত। স্ত্রীর চিকিৎসার জন্যে তার ব্যয় হয় অনেক টাকা। স্থানীয় চিকিৎসায় রোগ ভালো না হলে, সে তাকে চিকিৎসা করানোর জন্য চাঁদবরণ ঘাটের ভালো ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়। এভাবে আয়হীন সংসারে দিনের পর দিন চিকিৎসার জন্যে ব্যয় করতে করতে তার অভাব তীব্রতর হয়। তখন সে বিক্রি করে পিতার কাছ থেকে পাওয়া জমি। উপন্যাসে এ প্রসঙ্গে আছে, ‘কিছুদিন ধান চাল কিনে চলেছে, আর ধান চাল কোনার পয়সা নেই। অতএব চাচা বদর শেখকে কাইন্দাপাড়ার দক্ষিণদিকে ডোবা জমিটাও বিক্রি করতে হয়েছিল।’

মুহাম্মদ মুস্তফার বাবা খেদমতুল্লা সম্পর্কে উপস্থাপিত ঘটনাবলি থেকে জানা যায় চাঁদবরণ ঘাট ও তার কাছাকাছি অঞ্চলের মানুষের জীবনচিত্র। প্রথম জীবনে খেদমতুল্লা ছিল সদাহাস্য একজন মানুষ ; সমাজের সকলের সঙ্গে তার ছিল ভালো সম্পর্ক। বহুমুখী কাজের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল খেদমতুল্লা। কবিগান হতো সে অঞ্চলে, কবিয়ালদের সঙ্গে সে গানও ধরতো কখনো। সেখানে একই সঙ্গে ছিল চর দখলের লাঠিবাজীও। খেদমতুল্লা লাঠিবাজীতেও যোগ দিত। এক পর্যায়ে খেদমতুল্লা মন দেয় ব্যবসায়। সেখানে নানা ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য চলত। সুপারি চালান করার ব্যবসায় যোগ দিয়েছিল সে, তাতে সাফল্য পায় নি। এরপর ‘নৌকা-খাটানো’র ব্যবসায় সুবিধা হয় নি তার। অবশেষে সে পানের ব্যবসা করে। কিন্তু তাতেও তার লোকসান হয় খুব বেশি। এভাবে শূন্য হাত হয়ে বেকায়দায় পড়েছিল খেদমতুল্লা। তখনকার সেই আর্থিক অনটনের মধ্যেই সে বিয়ে করেছিল আমেনা খাতুনকে।  সে সূত্রে জানা যায়, সমাজে সে সময়ে বাল্যবিবাহ ও বিধবা বিবাহ চালু ছিল। আমেনা খাতুনের বাল্য কালে বিয়ে হয়েছিল আফজাল শেখের সঙ্গে। বিয়ের সময় আমেনা খাতুন ছিল ‘বালিকামাত্র’। পরে বিধবা আমিনা খাতুনের সঙ্গে খেদমতুল্লার বিয়ের প্রস্তাবে কেউ কোন বিরোধ করে নি। এ বিষয়ে উপন্যাসে আছে :

আত্মীয়স্বজন মুরুব্বিরা এবং গ্রামের নেতৃস্থানীয় লোকেরা সবাই সেটি এককণ্ঠে সমর্থন করে।

অর্থকষ্ট থেকে রেহাই পাওয়ার জন্যে অনবরত চেষ্টা করে খেদমতুল্লা। অবশেষে সে কলের কাপড়ের ব্যবসায়ে জড়িয়ে রাতারাতি আর্থিক উন্নতি করে। আর্থিক সাফল্যের সঙ্গে ঘটে তার চিন্তারও পরিবর্তন। সে ‘তিন ক্রোশ দূরে’ চাঁদবরণঘাটে বাড়ি করে বসবাস শুরু করে। কিন্তু তার সে সুখ বেশি দিন স্থায়ী হয় নি। কেননা হঠাৎ করে ব্যবসায় উন্নতি হলেও তা রক্ষা করার মতো দূরদৃষ্টি তার ছিল না। ব্যবসায়িক ষড়যন্ত্রের কাছে পরাজিত হয় সে। মাড়োয়ারিরা দখল করে নেয় লাভজনক কাপড়ের ব্যবসা। বাধ্য হয় খেদমতুল্লা ব্যবসা হারাতে। ফলে তার জীবনে নেমে আসে পুরনো অর্থকষ্ট। এ প্রসঙ্গে উপন্যাসে বলা হয়েছে :

‘অতর্কিতভাবে ব্যবসাটি হারিয়ে খেদমতুল্লা হয়তো জীবনে প্রথম একটি গভীর আঘাত বোধ করে, ন্যায়বিচারহীন নিষ্ঠুরতার বিষয়েও সজ্ঞান হয়।

নিষ্ঠুরতার মুখোমুখি হয়ে খেদমতুল্লার মনোজগতে বিরাট পরিবর্তন ঘটে। সে হয়ে ওঠে স্নেহ, দয়া-মায়াহীন, কপট-হিংস্র ও কুটিল। মানুষের ওপর সে হারায় বিশ্বাস, তার চরিত্রে নেমে আসে সীমাহীন কৃপণতা। সে গ্রহণ করে এক নতুন পেশা, আদালতে বিভিন্ন মামলায় সাক্ষী দেওয়া। ক্রমে সে তার পেশার পরিধি বিস্তার করে, প্রথমে মহাকুমা, পরে জেলা, এরপর প্রদেশের রাজধানীতে ঘুরে ঘুরে সে কাছারি-আদালতে বিভিন্ন মামলায় সাক্ষী দিত। মিথ্যা সত্য নানা ফন্দিতে সাক্ষী দিয়ে একবার সে অনেক টাকা পেয়েছিল। টাকা পেয়ে সে আবারও ব্যবসায় নেমেছিল। পাটের ব্যবসা চাঁদবরণ ঘাটেই নয় শুধু, বাংলাদেশের অন্যান্য এলাকায়ও চালু ছিল। সে ব্যবসায়ও উন্নতি হয় নি তার। পেশাদারী সাক্ষী দেওয়ার উদ্ভট কাজটি ছাড়ার ইচ্ছা থাকলেও, মন থেকে সে তা তাড়াতে পারে নি। তা ছাড়া তার মধ্যে রয়ে যায় চরিত্রের উৎকট সব দোষগুলো। সেসব দোষে তাড়িত হয়েই সে স্ত্রী পুত্র থাকা সত্তে¡ও বাড়িতে বাঁদি রাখে। সে সময় মুসলিম সম্ভ্রান্ত পরিবারের রীতি অনুযায়ী বাঁদি রাখা প্রচলিত ছিল। তারা বাঁদি রাখত মূলত নিজেদের আয়েশের জন্য। এ প্রসঙ্গে উপন্যাসে আছে :

বাঁদি রাখার শখও চাপে তার এবং দ্বিতীয়বার বিয়ে না করে নূতন-নূতন যুবতী বাঁদির আমদানি করতে শুরু করে এ-গ্রাম সে-গ্রাম থেকে।

সামগ্রিক ভাবেই খেদমতুল্লা তখন হয়ে পড়ে বিদঘুটে একজন মানুষ। সে তার নানা নীতিহীন ভাবে অত্যাচার করত তার একমাত্র ছেলে মুহাম্মদ মুস্তফাসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের ওপর। খেদমতুল্লার মৃত্যুর পর তার নিথর দেহটির দিকে তাকিয়ে কথক-১ বলেছিল :

যে-হুঙ্কার গত ক-বছরে পশুর আর্তনাদের মত হয়ে উঠেছিলো, মানুষের মনে অকথ্য সন্ত্রাস সৃষ্টি করতো, সে-হুঙ্কার আর কেউ শুনতে পাবে না।

পরিবারের ওপর নির্যাতন-নিষ্ঠুরতা চালালেও খেদমতুল্লা সন্তানের ভবিষ্যৎ ভুলে যায় নি। পুত্রের ভবিষ্যৎ চিন্তায় কিছুটা বিচলিত ছিল সে। খেদমতুল্লা মুহাম্মদ মুস্তফাকে নাম করা উকিল বানাবে। উকিলরাই সব সত্যকে মিথ্যা আবার মিথ্যাকে সত্যে পরিণত করার ক্ষমতা রাখে। কাছারি-আদালতে সাক্ষীর কাজ করতে গিয়ে সে প্রত্যক্ষদর্শী হয় উকিলের কান্ডকারখানার। ‘ওকালাতি লাভজনক পেশা বিধায় মোড়ল মামলা মোকদ্দামার দালাল ও বিত্তশালী লোকদের মধ্যে সন্তানদেরকে উকিল বানানোর আগ্রহ দেখা যায়।’ উকিলের এ পেশার প্রতি দুর্বলতা জন্মে। সে নিজে অশিক্ষত হলেও শিক্ষার প্রতি তার অনুরাগ ছিল। খেদমতুল্লার মৃত্যু হয়েছিল আততায়ীর হাতে। জমি-জমা নিয়ে বিরোধ, আর সংঘর্ষের ঘটনা খুনাখুনিতে রূপ নিত। অমন এক শত্রুতাবশতই খুনের শিকার হয়েছিল খেদমতুল্লা।

ছোটবেলা থেকেই মুহাম্মদ মুস্তফার মনে বিস্তার ঘটেছিল এক ‘অনতিক্রমনীয় আতঙ্ক’। ভয়, কুসংস্কার আর কুপমন্ডকতা বাল্যকাল থেকেই তার চরিত্রে স্থান করে নিয়েছিল। এ বিষয়ে একজন সমালোচক বলেছেন : 

শৈশবেই তার মনে গেঁথে গেছে সামাজিক সংস্কারের ভয়, কুসংস্কারের ভয়, প্রকৃতিতে ভয়, অতিপ্রাকৃততে ভয়-ইহকালভীতি, পরকালভীতি। যে-পারিপার্শ্বিক অবস্থার মধ্যে সে মানুষ হয়েছে সেই পারিপার্শ্বিকতাই তাকে একটি ভীরু প্রাণীতে পরিণত করেছে। তাছাড়া তার জীবনে নঞর্থক একটি ভূমিকা পালন করেছে তার পিতা : বস্তুত সে তার পিতার বিপরীত।

মুহাম্মদ মুস্তফার বাড়ির পেছনের শ্যাওলা ভরা বদ্ধ ডোবার পাশের তেঁতুলগাছ তলার ‘কালুগাজি' সম্পর্কিত অতিপ্রাকৃত কুসংস্কারাচ্ছন্ন বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে নিম্নরূপে : 

…কালুগাজি হাওয়ার মধ্যে অদৃশ্য হয়ে বিদ্যুৎ গতিতে মুক্তভাবে চলাফেরার ক্ষমতা রাখতো, যে আসলে মানুষ নয় দেহকায়াহীন একটি আত্মাই ছিল, …একদিকে শরৎ কালের কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল বেলায় তেঁতুলগাছের দিকে গ্রামের একটি লোকের দৃষ্টি পড়তেই তার অন্তরাত্মা থরথর করে কেঁপে উঠে, কারণ সে দেখতে পায় কে যেন সে-গাছের তলে স্থির-নিশ্চল হয়ে বসে। …লোকটি একদিন লক্ষ্য করে, মুহাম্মদ মুস্তফা বা অন্যান্য ছেলেরা সর্বদা যেন একটি অদৃশ্য সীমারেখার অন্য পাশে দাঁড়িয়ে থাকে, কখনো তা অতিক্রম করে না। একদিন সে মুহাম্মদ মুস্তফাকে বলে, যাও, যাও ওদিকে, কোন ভয় নেই। প্রথমে মুহাম্মদ মুস্তফার শিশুসরল চোখে গভীর ভীতি জাগে, মন-প্রাণ পাথরের মত জমে শক্ত হয়ে পড়ে, কিন্তু শীঘ্র সহসা কোত্থেকে একটা বিচিত্র সাহস দেখা দেয় তার মধ্যে, যে সীমারেখা সে কখনো অতিক্রম করে নি সে-সীমারেখা অনায়াসে পেরিয়ে যায়।

কালুগাজিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা কাহিনী তাদের মধ্যে বহুল প্রচারিত। তা যেন রূপকথার কাহিনী ছাপিয়ে হয়ে ওঠে লোক-সংস্কৃতির উপাদান। মুহাম্মদ মুস্তফা ভয় পেয়েছিল সমবয়সী ছেলেদের সঙ্গে সাঁতরে সুভদ্রা নদী পার হতে গিয়ে। সে মনে করেছিল নদীর অতল পানিতে রয়েছে ‘কিম্ভুতকিমাকার’ হিংস্র-দৈত্য দানব। এ প্রসঙ্গে উপন্যাসে আছে :

ভয়টি নিতান্ত অহেতুক তা বুঝতে পারলেও সে-ভয় দমন করতে সক্ষম হয় না এবং দেখতে-না-দেখতে তার হাত-পা অবশ হয়ে পড়বার উপক্রম হয়। অপর পাড়টিও হঠাৎ যেন বহু দূরে সরে যায়, সেখানে একটু আগে যে-সব বাড়িঘর বা ঘাটে বাঁধা নৌকা দেখতে পেয়েছিলো সে-সব দূরত্বে অস্পষ্ট হয়ে ওঠে। অতখানি পথ কী সে অতিক্রম করতে পারবে ? তার অগেই কী পানির মধ্যে থেকে একটি বিচিত্র জন্তু তার পা কামড়ে ধরে তাকে অতলে টেনে নিয়ে যাবে না? …যখন সে উলটো পথ ধরবে তখন তার মনে হয় পেছনের দিকে তাকালে দেখতে পাবে নদীর যে-তীর সবেমাত্র ছেড়ে এসেছে সে-তীরও নিকটে নয়, সামনের তীরের মত সে-তীরও বহুদূরে সরে গিয়েছে।

মুহাম্মদ মুস্তফা আতঙ্কিত হয়েছিল গ্রামে হামজা মিঞা নামের মৌলভীর ‘ঈমানে মুফাচ্ছল’ প্রসঙ্গে ব্যাঘ্র কণ্ঠের বিচিত্র প্রশ্নবাণে। এ সম্পর্কে উপন্যাসে আছে :

আজানা ভয়ে সমগ্র অন্তরে হিমশীতল হয়ে পড়ে, তার মনে হয় আকাশ অন্ধকার করে কেয়ামতি ঝড়-তুফান আসতে দেরি নেই, শীঘ্র কোথাও সহস্রাধিক হিংস্র ক্রুদ্ধ সিংহও কান-বধির-করা আওয়াজে গর্জন শুরু করবে।

ভয় মুহাম্মদ মুস্তফাকে স্পর্শ করেছিল এক ‘নির্বোধ’ নারীর কাছে পাওয়া খোদা সম্পর্কিত ধারণায়। তার মনে জেগেছিল অদ্ভুত ভীতির প্রতিক্রিয়া। মেয়ে মানুষটি তাকে বলেছিল ‘খোদা নাকি দেখতে কলিজার মত, এবং কলিজার মত প্রতি মুহূর্তে থরথর করে কাঁপে।’ খোদার আকৃতি-অবয়বের ধারণার সঙ্গে সে খোদার গজব সম্পর্কেও জেনেছিল। সমবয়সী কয়েকজন দুষ্ট ছেলে ষড়যন্ত্র করে তাদের সমবয়সী অন্য একজন শারীরিক ভাবে দুর্বল ধরনের ছেলেকে গাছের সঙ্গে মাথা নিচু করে ঝুলিয়ে মেরেছিল। এই পাষাণ কাজে মুহাম্মদ মুস্তফা অংশ নেয় নি। দর্শকের মতো সে তাদের সঙ্গে ছিল। মার খাওয়া ছেলেটি তখন অনন্যোপায় হয়ে অত্যাচারীদের ওপর খোদার গজব-বালা পড়বে বলে চিৎকার করেছিল। তাতে মুহাম্মদ মুস্তফার মনে জন্মেছিল ভীতিকর প্রতিক্রিয়া। সেদিন রাতেই খোদার গজব সম্পর্কে তার মনে একটি বিচিত্র ধারণা জন্মেছিল। এ প্রসঙ্গে উপন্যাসে বলা আছে :

কালো মাটির দলার মত নাক মুখ কান শূন্য অঙ্গ প্রত্যঙ্গহীন একটি জন্তু গোঁ গোঁ আওয়াজ করে গ্রামের জনশূন্য পথেঘাটে ছুটোছুটি করছে কিসের সন্ধানে। সে-বিচিত্র ভয়াবহ নামহীন জন্তুটি বারবার তার মনে দেখা দিয়ে বেশ কিছুদিন তাকে নিপীড়িত করে।

তার পিতা খেদমতুল্লার কাছ থেকে স্নেহ মমতার বদলে পাওয়া নিষ্ঠুর ও নির্মম আচরণও মুহাম্মদ মুস্তফার মনকে করে তুলেছিল ভীত-সন্ত্রন্ত। এর ফলে নাবালক মুহাম্মদ মুস্তফার জীবনে ঘটে বিরাট পরিবর্তন। জীবনে প্রথম বীর্যপাতের অচেনা ঘটনায় ‘ভীতবিহ্বল হয়ে’ মুহাম্মদ মুস্তফা বিষয়টি তার বাবাকে জানিয়েছিল মূলত সমবেদনা পাওয়ার জন্যে। কিন্তু ঐ বিষয়টি সহানুভূতির দৃষ্টিতে বিচার করার ক্ষমতা ছিল না ‘ক্রোধান্ধ’ খেদমতুল্লার। তাই সে :

প্রথমে ছেলেকে উঠানে টেনে নিয়ে গিয়ে একটি শক্তবাঁশ দিয়ে তার দেহের পশ্চাদভাগে মত্ত ক্রোধপ্রসূত প্রচন্ড শক্তির সাহায্যে অবিশ্রান্তভাবে প্রহার করে, তারপর কতক্ষণ উন্মত্ত মানুষের মতো যত্রতত্র লাথি মারে। মুহাম্মদ মুস্তফা একটি শব্দ করে নি। তার রহস্যময় অভিজ্ঞতার, তারপর তারাখচিত আকাশের তলে এই নির্দয় প্রহার-সবই তার কাছে দুর্বোধ্য মনে হয়ে থাকবে। তার পক্ষে বেশি ভাবাও সম্ভব হয় নি, কারণ বাপের লাথিতে একসময় সে সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলে।

উক্ত ভীতিকর অভিজ্ঞতাগুলো তার মানসভূমিতে ক্রিয়াশীল ছিল আজীবন।

শিক্ষা ছাড়া জীবনের মূল্য নেই, সে কথা কুমুরডাঙ্গা-চাঁদবরণ ঘাটের মানুষেরা ঠিকই বুঝেছিল। ফলে মুহাম্মদ মুস্তফার মতো অনেকেই শহরে থেকে লেখাপড়া শিখত। দু’বছর পর মুহাম্মদ মুস্তফা ছুটিতে বাড়ি এসে গ্রামের পরিচিত পথ-ঘাট ঘুরতে বের হয়েছিল। এক পর্যায়ে সে হাতালিয়ার বিখ্যাত বটগাছ তলায় এসে থেমেছিল। হাতালিয়ার বাসিন্দা কালুমিঞা। সে দুর্বৃত্ত। প্রথম জীবনে সে ছিল দরিদ্র। পরবর্তীতে সে অনেক অর্থ বিত্তের মালিক হয়েছিল।  কালু মিঞা এক বিধবার সম্পত্তি প্রতারণা করে দখল করেছিল। বস্তুত, নানা কৌশলে সে প্রচুর জোত-জমি ও ধন-সম্পদের মালিক হয়েছিল। তবে, গরীব-দুঃখীদের মধ্যে সে অকাতরে অর্থ দান করত। মানুষকে ধার-কর্জ দিয়ে তা আদায়ে বিশেষ তাগাদা দিত না। কালু মিঞার জীবনের এই উত্থান ঘটে আর এক দুর্বৃত্ত খেদমতুল্লার চোখের সামনে। ঈষান্বিত হয়ে সে তা মানতে পারে নি ; তাই কালু মিঞার অপকর্ম সম্পর্কে সে মানুষকে জানায়, জনসমাজে তুলে ধরে তার শঠতা, মিথ্যাচার, ছলনা, প্রবঞ্চনার ইতিহাস। খেদমতুল্লাও কৌশলে সে সম্পত্তি নিজ অধিকারে আনার চেষ্টা করেছিল। এতে কালুমিঞা প্রচন্ড ক্ষুব্ধ হয় খেদমতুল্লার ওপর। সে হয়ে ওঠে প্রতিশোধ-পরায়ণ। দুই দুর্বৃত্তের অন্তর্দ্বন্ধের পরিণামে খেদমতুল্লা আততায়ীর হাতে নিহত হয়। হত্যাকান্ডের এই ভয়াবহ চিত্র সে সমাজের বর্বরতার পরিচয় বহন করে। স্বার্থান্ধ-অবিবেচকদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত সে সমাজ। দুর্বৃত্ত নেতা কালু মিঞাই যে খেদমতুল্লার হত্যাকারী তা মানুষেরা বুঝেছিল পড়ে থাকা লাশের স্থানে তার বিশ্বস্ত সহচর মীরন শেখকে দেখে। সেই দুর্বৃত্তদের সঙ্গেই সেদিন সন্ধ্যায় হাতালিয়ার বটতলায় মুহাম্মদ মুস্তফার দেখা হয়েছিল। তারা তাতে ভীত হয়ে পড়েছিল, তারা ভেবেছিল খেদমতুল্লার ছেলে তার বাবার হত্যাকারীদের খুঁজে বের করবে, নেবে প্রতিশোধ। তাই কালুমিঞা ও তার লোকেরা আত্মরক্ষার পরিকল্পনা করে। অভিনব কায়দায় নিজেদের নির্দোষ হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা চালায়। তা যেন তার শঠতার আর এক মাত্রা। সে ক্ষেত্রে তারা ব্যবহার করেছিল মসজিদ। সেখানে প্রতিদিন  প্রতিবেলাই মুসল্লিরা আসে নামাজ পড়তে। তবে শুক্রবার জুমার নামাজে প্রতিদিনের চেয়ে অপেক্ষাকৃত বেশি মানুষ নামাজ পড়তে আসে। মসজিদে মুসল্লিদের মধ্যে নামাজের অবসরে ঘটে ভাব নিনিময়। তারা একে অপরের কুশলাদি জানতে চায়, আলাপ আলোচনাও করে গ্রামের-দেশের নানা কথা নিয়েও। এই মসজিদেই কোন এক শুক্রবার দুই সহযোগীর কাঁধে ভর করে উপস্থিত হয় কালুমিঞা। মসজিদে উপস্থিতদের জানায়, খেদমতুল্লা হত্যাকান্ডের সঙ্গে সে জড়িত নয়। তাতে খেদমতুল্লা হত্যা রহস্য অনেকটা হালকা হয়ে যায়। মসজিদে উপস্থিত হয়ে হত্যা প্রসঙ্গে কালু মিঞা অবস্থান নেওয়ায় সে আশ্রয় পায় ঈমান-আকিদার তৈরি দুর্গে। এক ধরনের ঠক, প্রতারকরা সব সময়ই ধর্মকে আশ্রয় করে নানা অন্যায়-অত্যাচার চালায়। সরলপ্রাণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে এরা কাজে লাগায়। এ প্রসঙ্গে মসজিদে উপস্থিত মুসল্লিরা বলেছে :

খবরটি বাড়ির সবাইকে স্তম্ভিত করে। বস্তুত কিছু সময়ের জন্যে সকলে কেমন বাক্শূন্য হয়ে পড়ে। তাদের মনে হয়, মসজিদ ঘরে কথাটি বলে ধূর্ত কালুমিঞা আমাদের সঙ্গে বড়ই শয়তানি করেছে, যেন যাকে আমরা প্রায় ধরে ফেলেছিলাম সে হাত থেকে ফস্কে গিয়ে একটি দূর্গের মধ্যে আশ্রয় নিয়েছে। দূর্গটি সাধারণ দূর্গও নয়, সেটি আকায়িদ-ঈমানে তৈরি দূর্গ।

সমাজ অভ্যন্তরে এমন দুর্বৃত্তদের আশ্রয় দিয়েই সাধারণ মানুষ কাল কাটায়। কখনও তারা এমন ভয়ঙ্কর অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সাহস পায় না। নানা কারণে প্রশাসনও থাকে নীরব। এ প্রসঙ্গে উপন্যাসে আছে :

সরকার বা পুলিশ কিছু করবে না, সুবিচারের আশা দুরাশা মাত্র। কালুমিঞার তখন সমগ্র অঞ্চলে প্রচন্ড প্রতিপত্তি ; কালু মিঞাই যে খেদমতুল্লার হত্যার জন্যে দায়ি সে-বিষয়ে কারো কাছে জলজ্যান্ত সাক্ষি-প্রমাণ থাকলেও সে সাক্ষি-প্রমাণ নিয়ে এগিয়ে আসবে না তাও জানতো। বস্তুত, কেউ একবার বেফাঁসে একটি কথা বলে ফেলে মুখে যে খিল দিয়েছিলো আর টুঁ শব্দ পর্যন্ত করে নি ; একটি মানুষের ঘাড়ে ক-টাই বা মাথা।

মুহাম্মদ মুস্তফা কালুমিঞার মসজিদে উপস্থিতিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখেছিল। কারণ, সে মসজিদে নামাজীদের কাছে নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ চেষ্টা করেছিল। কেননা, তারা ভয় পেয়েছিল মুহাম্মদ মুস্তফাকে বটতলায় দেখে। তারা ভেবেছিল যে, সে তার পিতৃহত্যার প্রতিশোধের নেশায় ঘুরছে। প্রকৃতপক্ষে মুহাম্মদ মুস্তফার বটতলায় উপস্থিতি ছিল উদ্দেশ্যহীন। পিতা খেদমতুল্লা হত্যা প্রসঙ্গে তার কোন প্রতিশোধস্পৃহা ছিল না। সে কথা চাচাত ভাইয়ের মাধ্যমে কালু মিঞার লোকদের জানাতে চেয়েছিল। কিন্তু তার চাচাত ভাই সেখানে না যাওয়ায় মুহাম্মদ মুস্তফাকে পড়তে হয় মুখোমুখি সমস্যায়। তারা জঘন্যতম চক্রান্তে মেতে ওঠে। চরম নীচতার পরিচয় দিয়ে মুহাম্মদ মুস্তফাকে ফাঁসাতে পদক্ষেপ নেয়। যার নেতৃত্বে ছিল কালুমিঞার জামাই। এ প্রসঙ্গে উপন্যাসে বলা হয়েছে :

খেদমতুল্লার একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ : একই মুখের আকৃতি, একই নাক, একই থুতনি, একই ধরনের কেমন ছড়ানো কান। তারপর ছেলেটি আমার দিকে ক্ষণকালের জন্যে তাকালে তার চোখে যে রুক্ষতা দেখতে পাই সে-রুক্ষতাও অবিকল মুহাম্মদ মুস্তফার জন্মদাতার চোখেরই রুক্ষতা; খেদমতুল্লার চোখে এমন একটি ভাব ছিল যে মনে হতো নিদ্রা বলে কোন জিনিস সে জানতো না।

কালুমিঞার জামাই ও তার সঙ্গীরা খেদমতুল্লার মতো দেখতে বারো-তেরো বছরের একটি ছেলেকে ব্যবহার করেই প্রতিহিংসা পূরণ করতে উপস্থিত হয় মুহাম্মদ মুস্তফার বাড়ি ; তার চাচা ও চাচাত ভাইয়ের সামনে। সে ছেলেটিকে দেখিয়ে তারা মুহাম্মদ মুস্তফাকে তার জন্মদাতা বলে দাবি করে এবং সন্তান হিসেবে তার ভরণ-পোষণ দাবি করে। মুহাম্মদ মুস্তফা ভরণ পোষণের দায়িত্ব না নিলে এলাকার গণ্যমান্যদের সাহায্য নিয়ে তারা ছেলেটির ব্যয়ভার আদায় করে নেবে। তাদের সাজানো এই অপকৌশলের কাছে অসহায় হয়ে যায় মুহাম্মদ মুস্তফা। সে তার মান-সম্মান বাঁচাতে গোপনে কালুমিঞার সঙ্গে হয়তো মীমাংসা করেছিল। এ কারণে, বিষয়ে আর কোন কথা শোনা যায় নি। এ ঘটনা থেকেই সে সময়কার সামাজিক পরিস্থিতি অনেকখানি অনুধাবন করা যায়। এ প্রসঙ্গে উপন্যাসে আছে :

বাপ বেঁচে নেই বলে সৎভাইকে জন্মদাতায় রূপান্তরিত করলে ভরণ-পোষণ আদায় করা হয়তো সহজ এবং এমন ধরনের রূপান্তর যে অতিশয় জঘন্য তা হয়তো নিচ প্রকৃতির লোকদের পক্ষে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়।

একদিকে পিতার হত্যাকারী কালুমিঞার জঘন্য ষড়যন্ত্র, অন্যদিকে ফুফাতো বোন খোদেজার মৃত্যুতে মুহাম্মদ মুস্তফা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।

কুমুরডাঙ্গায় মুহাম্মদ মুস্তফার একাকী বসবাসের সঙ্গী হয় তবারক ভুঁইঞা। স্টীমার কোম্পানীর চাকরির থেকে অবসর পাওয়া তবারক ভুঁইঞা উপযাচক হয়েই ছোট হাকিমের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেছিল। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সঙ্গে ঘনিষ্টতা স্থাপনের ফলে তার সামাজিক মর্যাদাই বৃদ্ধি পায়। ছোট হাকিমের চোখেও বিষয়টি পড়েছিল, সে এ ধরনের ঘনিষ্টতাকে সামাজিকতা মনে করে বলেছিল :

কারো বাড়িতে গ্রাম থেকে ঝুড়িভরা আম-লিচু এসেছে, কারো ঘরে ছেলে খাৎনা উপলক্ষে মিঠাই-মন্ডা তৈরি হয়েছে, কেউ আবার বিশেষ কোন কারণে গরু-বকরী জবাই করেছে এ-সব বাড়ি বাড়ি বিতরণ করা সামাজিক প্রথা। সুখে-দুঃখে একটি মানুষ আর একটি মানুষকে স্মরণ করে- এই তো সমাজ।

কুমুরডাঙ্গার এই অনাত্মীয় তবারক ভুঁইঞার কাছে জ্বরের সময় আশ্রয় নিয়েছিল ছোট হাকিম। সে সময় মানসিক যন্ত্রণা এড়ানোর জন্যেই সে খোদেজা প্রসঙ্গে জানিয়েছিল তবারক ভুঁইয়াকে। সে বিষয়টিকে দেখে কল্পনার আশ্রয়ে, এটি হত্যা না আত্মহত্যা তা যুক্তি-বুদ্ধি দিয়ে বিচারের দিকে যায় নি মুহাম্মদ মুস্তফা। সে ধারণা করে খোদেজার মৃত্যু নিছক দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা নয় ; তার এ ধারণার পেছনেও নেই কোন যুক্তি। কল্পনা নির্ভর হয়ে সে এ বিষয়টি বিচার-বিবেচনা করে, তার সে কল্পনার জগতে রয়েছে অজানা শক্তির যোগ। সে নিজ কল্পনায় একাকার করে নেয় তবারক ভুঁইঞাকে। নিজ কল্পনায় দেখা দৃশ্য যেন দেখছিল তবারক ভুঁইঞা। মুহাম্মদ মুস্তফার মনের ভীতিকর পরিস্থিতি তাকে যুক্তিনির্ভর হতে দেয় নি। তার মনে ক্রিয়াশীল ছিল দ্ব›দ্ব। মনের পীড়া ও সংশয় মুক্তির জন্যেই সে একদিন রাতে অকারণে তবারক ভুঁইঞার কাছে বিষয়টি উত্থাপন করে, ‘বাড়ির লোকদের কথা ভাবছিলাম কী করে তারা তেমন একটা কথা ভাবতে পারে বুঝি না।’ তবারক ভুঁইঞাও তার কথায় সমর্থন দিয়ে বলে : ‘আমিও বুঝি না।’ তার এ সমর্থিত কথায় মনে স্বস্তি আসে নি মুহাম্মদ মুস্তফার। তার চিন্তা প্রবাহিত হয় অন্য দিকে। তার কল্পনার দৃষ্টি হয় প্রসারিত। সে কল্পনা করে :

তার দৃষ্টি একটা পুকুরের ওপর নিবদ্ধ। পুকুরটি শ্যাওলা আবৃত বদ্ধ ডোবার মতো, যে-পুকুরে একটি মেয়ে ধীরে-ধীরে নাবছে। পাড় থেকে ধাপ-কাটা একটি নারকেল গাছের গুঁড়ির যে-সিঁড়ি পানির দিকে চলে গিয়েছে, সেটা বেয়ে নাবছে। এক ধাপ, দুই ধাপ-পাশাপাশি করে রাখা দু’টি পায়ে সন্তর্পণে কিন্তু অনায়াসে সে নেবে যাচ্ছে অনেকদিনের অভ্যাসের ফলে। এবার তৃতীয় ধাপ। সে-ধাপের পরে কালো পানি। নিস্তরঙ্গ বদ্ধ পানি। মেয়েটি নেবেই চলে। প্রথমে হাটু-পানি তারপর কোমর পানি, অবশেষে বুক পর্যন্ত ওঠে সে-পানি। এবার মেয়েটি আর না নড়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে, দৃষ্টি কালো পানির দিকে। যেন তার মধ্যে দ্বিধা-সংশয় দেখা দিয়েছে, যেন এবার কি করবে তা সে ঠিক বুঝতে পারছে না, তার গাঢ় শ্যামল ক্ষুদ্র মুখাবয়বে নিথর ভাব, তারপর হঠাৎ সে এমন ভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে যেন পেছন থেকে কেউ তাকে ধাক্কা দিয়েছে, মুখ দিয়ে অস্ফুট আর্তনাদ নিঃসৃত হয়। শীঘ্র তার মাথা, মাথার উপরাংশ, তারপর মাথার যে-চুল পানিতে ছড়িয়ে পড়েছিল সে-চুল অদৃশ্য হয়ে যায়। কিন্তু আবার তাকে দেখা যায়, কারণ সে ভেসে ওঠে। হয়তো অল্পক্ষণ সে ভয়ানকভাবে হাত-পা নাড়ে, ভেসে থাকার চেষ্টা করে, কিন্তু ক্রমশ তার দেহ স্তব্ধ হয়ে পড়ে, কাঠের মত, তারপর পাথরের মত। এবং একবার তার দেহ পাথরে পরিণত হলে চোখের পলকে সে শ্যাওলা-আবৃত বদ্ধ পানিতে অদৃশ্য হয়ে যায়।

মুহাম্মদ মুস্তফা দেখে কল্পনায় খোদেজাকে কোন এক লোক যেন ধাক্কা দিয়ে পানিতে ফেলে দেয়। সে ধাক্কা দেওয়া লোকটি মুহাম্মদ মুস্তফার চেতনায় অভিন্ন রূপ ধারণ করে। সে কারণে দ্রুত তার ভেতর ছড়িয়ে পড়ে অস্বস্তিকর যন্ত্রণা। সে যন্ত্রণা এড়াতেই অনাত্মীয় তবারক ভুঁইঞাকে ব্যক্তিগত বিষয় খোলাখুলিভাবে বলেছিল একটি নিরপেক্ষ মত পাওয়ার আশায়। তা যেন সে রাতে মুহাম্মদ মুস্তফার কাছে ভুল প্রতীয়মান হয়। রাতভর ভেবে শেষ রাতে তন্দ্রার ঘোরে সে সিদ্ধান্ত নেয় এ রকম, ‘তবারক ভুঁইঞা বাড়ির লোকদের কথা বিশ্বাস করেছে কারণ সেটাই সত্য, খোদেজা আত্মহত্যাই করেছিল।’ এতদিন মুহাম্মদ মুস্তফা ‘নানা অকাট্য’ যুক্তি দিয়ে খোদেজার মৃত্যু সম্পর্কে মানুষের অমূলক ধারণা ঠেকিয়ে রাখলেও- যখন সে বুঝতে পারলো তবারক ভুঁইঞার মত একান্ত পরিচিত লোকও একই রকম মত পোষণ করে তখন তার ধারণাটি বালির বাঁধের মত ভেঙে যায়।

এরপর কথক-১ মুহাম্মদ মুস্তফা সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে তাদের পারিবারিক বিষয়ের নানা অনুষঙ্গ উপস্থাপন করে। তাতে তাদের সামাজিক তথা আর্থিক বিষয়ের পরিচয় পাওয়া যায়। তাদের পারিবারিক আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। তারা চাঁদবরণঘাট এলাকায় নানা রকম পেশায় ছিল জড়িত। লেখাপড়ার বিষয়ে তারা ছিল উদাসীন। কথক-১ এর ভাই সোনামিঞা লেখাপড়া শিখে নি। জীবন ধারণের জন্যে তবু তাকে বেছে নিতে হয় একটি পেশা। পেশা যেমনই হোক, পেশা তথা উপার্জন ছাড়া মানুষের বাঁচা কঠিন। সোনামিঞা চাঁদবরণঘাটে মুড়িমুড়কির দোকান খুলেছে। সে দোকান থেকে অর্জিত অর্থে তার সাংসারিক খরচ চলে। তাদের ছোট চাচার ছেলে হাতেম আলীও লেখাপড়া শেখে নি। সে অসম্ভব রকম অলস। অশিক্ষিত-অলস-কর্মবিমুখ লোকগুলো একপর্যায়ে চরম অর্থকষ্টে পতিত হয়। সংসারের নানা অভাব-অভিযোগ তাদের লেগেই থাকে। দারিদ্র্যের কারণে মানুষের মেজাজও সব সময় ঠিক থাকে না। এমনই অর্থকষ্টে কথক-১ এর বাবার মেজাজ বিগড়ে গিয়েছিল। শত চেষ্টায়ও সে আর্থিক উন্নতি ঘটাতে পারে নি বলে তার মনে ক্ষোভ ছিল। তাই প্রতিবেশী দুদু শেখের আর্থিক উন্নতিতে সে হয়েছিল ঈর্ষান্বিত। সামান্যতেই সে অসম্ভব রাগ করতো। একদিন প্রায় অকারণেই সে খোদেজাকে চুল ধরে টেনে চড়-থাপড় মেরেছিলো। খোদেজা নামের পিতৃহীন এই মেয়েটি তার মামার বাড়ি আশ্রিতা ছিল। শ্যামলা বরণ, ক্ষীণদেহী ও দীর্ঘাঙ্গী মেয়েটি ছিল নিভৃতচারী-সংসারমনা পল্লীবাংলার একটি সাধারণ মেয়ে, সংসারের নানা কাজ-কর্মে ছিল নিপুণা। এ ছাড়াও সে হাঁস-মুরগী পালন করতো। খোদেজার সঙ্গে মুহাম্মদ মুস্তফার প্রেম সম্পর্কে অস্পষ্ট সত্যটি  সেদিন কথক-১ এর সঙ্গে বলা কথায় পরিষ্কার হয়ে উঠে। সে বলে :

“মুস্তফা ভাইকে বড় ভয় করে।”... 
“আমাকে ভয় করে না ?”
সজোরে মাথা নেড়ে সে উত্তর দেয়, 
“না।” 

অতীতের এই তথ্যের কথা মনে করে কথক-১ বাড়ির লোকদের কথায় সায় দিতে পারে না। সে জানে মুহাম্মদ মুস্তফার সঙ্গে তার কোন প্রেমের সম্পর্ক ছিল না। কিন্তু বাড়ির সবাই একজোট হয়ে অন্য কথা প্রচার করেছে। পিতৃহীন আশ্রিতা খোদেজার সব আশা-আকাক্সক্ষা গড়ে উঠেছিলো তাকে জড়িয়েই। তা অবলম্বন করেই সে বাঁচার স্বপ্ন দেখতো। ফলে স্বপ্ন ভাঙার শোকে কাতর হয়ে জীবনকে তুচ্ছ মনে করে আত্মহত্যা করে খোদেজা। তবে খোদেজা ও মুহাম্মদ মুস্তফার অবস্থানগত দিকটিও বিবেচনার বিষয়। খোদেজার সম্পর্কে সে ভাবত, গ্রাম্য অশিক্ষিত মেয়েটি তার জীবনসঙ্গিনী হওয়ার যোগ্য নয়। এই তারতম্য বাড়ির লোকদের চোখে পড়ে নি, নয়তো তারা তা উপেক্ষা করেছে। এক পর্যায়ে মুহাম্মদ মুস্তফা ‘সবকিছুই বুঝতে পেরেছে’; তন্দ্রাচ্ছন্ন চেতন-অবচেতনে সে মিথ্যা অপবাদকে খন্ডাতে পারে না, ভেবে নেয় আত্মহত্যা করে খোদেজা অপরাধ করে নি, বরং সে নিজেই অপরাধী। এ কারণে তার মধ্যে অনুপ্রবেশ করে ভীষণ এক ভয়, সে ভয় তীব্রতর হয় খোদেজার মৃত্যু রহস্য ঘিরে। তার মনের ভেতরের ভয় তাকে জাপটে ধরে। নানা প্রসঙ্গ স্মৃতিতে এনে সে ভয়কে অতিক্রম করতে চেষ্টা করে। কিন্তু তাতে কাজ হয় না। সেদিন রাতে সে ঘুমাতে পারে নি। আধো-ঘুম আধো-জাগরণে কুমুরডাঙ্গার সরকারি অফিসের বারান্দায় চেয়ারে বসে থেকেও তার মনে হয়, সে যেন বসে আছে একটি নৌকায়। তার মনে হয় এই খালের মধ্যে নৌকায় চড়ে দীর্ঘ পথ তাকে পাড়ি দিতে হবে এবং তখনই তার চোখে খাল নয়, ভেসে ওঠে একটি পুকুর। শ্যাওলা ভরা যে পুকুরে ডুবে মরেছিল খোদেজা, সেই পুকুরটি। পুকুরের পানিতে ভাসমান একটি মুখ দেখে মনে হয় সে যেন খোদেজা। তন্দ্রা কেটে গেলেও সে ধরে নেয় তন্দ্রাচ্ছন্ন চিত্রটি বাস্তবই। তা থেকে যেন মুক্তি পাওয়া কঠিন। মনে হয় বাইরের অন্ধকারে ‘কে যেন নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে নিস্পলক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে’। সে চোখ জোড়া কখনো স্কুল শিক্ষিকা সকিনার, কখনো মৃত খোদেজার বলে মনে হয় তার। তার মধ্যে বিশ্বাস জন্মে, খোদেজা প্রতিহিংসাপরায়ণ আত্মায় রূপ নিয়েছে, সারা জীবন সে তাকে অনুসরণ করবে। অদৃশ্য ভাবে তার ক্ষতি করবে। প্রতিহিংসাপরায়ণ আত্মার কবল থেকে মুক্তি পেতে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয় মুহাম্মদ মুস্তফা। তা কার্যকর করতে দড়ি হাতে চিলেকোঠায় গিয়েও যেন মৃত খোদেজার আত্মার উপস্থিতি লক্ষ করে। সেদিন তবারক ভূঁইয়ার উপস্থিতির কারণে তার আত্মহত্যা করা হয় নি। চিলেকোঠা থেকে মুহাম্মদ মুস্তফা দেখছিলো বাড়ির বাইরের দৃশ্য। বাড়ির পেছনে তবারক ভুঁইঞার উঠোন। সে দেখে তার ঘরের দৃশ্য, তকতকে নিকানো উঠোন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন বারান্দা, ঝকঝকে পেতলের বদনা ; নিমগাছের ছায়া ঘেরা জীবনের এই সুস্থতা কুমুরডাঙ্গারই গ্রামীণ জীবনের ছবি। বিশেষ করে তবারক ভুঁইঞার স্বাস্থ্যবতী স্ত্রীকে দেখে মুহাম্মদ মুস্তফার মনে হয়তো সংসার জীবনের স্বপ্ন উঁকি মেরেছিল। এ প্রসঙ্গে উপন্যাসে :

উঠানের মধ্যখানে এসে দাঁড়িয়ে সে থামে, তারপর এধার-ওধারে কিছু যেন খুঁজে হাত তুলে একবার খোলা চুল ঝাড়ে। পিঠভরা চুল, ভেজা, রোদে তাই চিকচিক করে। এদিকে পেছন দিয়ে দাঁড়িয়ে বলে মুখটা দেখা যায় না, তবে মেয়েটি স্বাস্থ্যবতী, নিটোল দেহের গঠনটা ভালো। পরনে ডোরাকাটা শাড়ি, পা খালি।

তার দিকে মুহাম্মদ মুস্তফার নিষ্পলক দৃষ্টি যেন তাকে সংসারমনা করে দেয়। কিন্তু তা স্থায়ী হয় না। বরং তার জীবনের ভয়ই তাকে অস্বাভাবিক ও উদ্ভূত ক্রিয়াকান্ডের দিকে টেনে নেয়। রাতের বেলা লণ্ঠনের আলোয় কলিজাটি আবার দেখতে পায় সে। স্পষ্ট ও অশান্ত কলিজাটি আগের চেয়ে জোরে থরথর করে কাঁপে। সে যে চৌকিতে বসেছিলো সে চৌকিটিও যেন কাঁপছিলো। যখন সে ঘরে রাখা স্যুটকেসের দিকে তাকায়, তখন তা যেন কাঁপতে থাকে এবং তা গাঢ় রং-এর কলিজায় রূপ নেয়। সে চোখ ঘুরিয়ে রাখে লণ্ঠনের প্রতি। কলিজাটি যেন তার দৃষ্টি অনুসরণ করে সেখানেও উপস্থিত হয়, পতঙ্গের মত রূপ ধরে ডানা ঝাপটায়। পতঙ্গটি পুড়ে মরবে বলে সে আশা করে কিন্তু তা পোড়ে না। এরপর মেঝেতে তাকালে সেখানেও দেখা যায় কলিজাটি, ডাঙ্গায় তোলা মাছের মত তা ছটফট করে। সে ভাবে পানির অভাবে একটু পরেই তা নিশ্চল হবে। কিন্তু তা হয় না। যেন ‘বিচিত্র কলিজাটি সত্যই অমর : আগুনে তা দগ্ধ হয় না, দম বন্ধ হলেও তার শ্বসনকার্য থামে না।’ মুহাম্মদ মুস্তফা প্রচন্ড ভয়ে কলিজার কথা উপেক্ষা করতে চেষ্টা করে, মনে মনে সে প্রতিবেশী তবারক ভুঁইঞার বাড়ির উঠানের কথা, বাড়ির বৌয়ের কথা, গরুর কথা ভাবে। সে উকিলের কথাও ভাবে। কিন্তু যা-ই ভাবুক, যা-ই তার চোখে ভাসুক না কেন থরথর করে কাঁপতে থাকা জন্তুর হাত থেকে তার মুক্তি নেই। অবশেষে কলিজাটি যেন ‘তার হৃদপিন্ডকে আঁকড়ে ধরেছে। …অদূরে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে খোদেজা অপেক্ষা করে।’ অতিপ্রাকৃত শক্তির প্রভাব থেকে মুহাম্মদ মুস্তফা মুক্তি পায় না। সে যে দিকেই দৃষ্টি দিক, দেখে এক জোড়া চোখ, নয়তো থরথর করে কাঁপতে থাকা কলিজাটি। সে প্রস্তুতি নেয় আত্মহত্যার, বাহুতে বাঁধা তাবিজগুলোও খুলে ফেলে বহু কষ্টে। তাবিজ-কবজের ব্যবহারের কুসংস্কারের সঙ্গে উপন্যাসে উপস্থাপিত অতিপ্রাকৃত বিষয়ের মিল রয়েছে। সে মনে করে ‘যে মেয়েটি আত্মহত্যা করে একটি প্রতিহিংসাপরায়ণ আত্মায় পরিণত হয়েছে, তাকে ছায়ার মত অনুসরণ করতে শুরু করেছে, সে-ই দায়ী তার বিভ্রান্তির জন্যে, সে-ই তাকে মৃত্যুর দ্বারে নিয়ে গিয়েছিলো ; …তার মন দখল করে তার ইচ্ছাশক্তি কাবু করে ফেলেছে, তাকে পরিচালিত করেছে নির্দয় ধ্বংসকারিণীর রূপ নিয়ে।’ তার এ অনুমানের সঙ্গে সে মিলিয়ে নেয় অতীতের ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো। সে উন্মোচন করতে চায় সে সবের গূঢ় রহস্য। সে ধরে নেয় তার ভাগ্যকে নিয়ন্ত্রণ করে খোদেজার আত্মা। তা না হলে বিয়ে করতে ঢাকা যাওয়ার দিন স্টীমার বন্ধ না-ও হতে পারতো ; তারপর হঠাৎ জ্বর আসা, জ্বর থেকে সেরে উঠে অলসতা করেই ঢাকায় না যাওয়া, বন্ধু তসলিমের চিঠির উত্তর না দেওয়া-সবকিছুতেই ‘প্রতিহিংসাপরায়ণ আত্মার ইচ্ছাই নিহিত।’ সে দেখতে পায় দুষ্ট আত্মার অবিমিশ্র জিঘাংসা ও অশুভ তৎপরতা। মৃত খোদেজার আত্মা দেখতে চায়, মুহাম্মদ মুস্তফার কারণেই সে আত্মহত্যা করেছে- এ কথা মুহাম্মদ মুস্তফা মানছে কিনা এবং এ মৃত্যুতে তার মনে কোন অনুশোচনা জন্মেছে কি-না। মৃত আত্মার ক্ষমতা দেখে মুহাম্মদ মুস্তফা অতিশয় ভীত হয়ে ওঠে। সে ভাবে ‘যে করে হোক নিজেকে বাঁচাতে হবে’ – এ কথা ভেবে মুহাম্মদ মুস্তফা কথক-১ বা চাচাত ভাইয়ের কাছে খোদেজার মৃত্যু সম্পর্কে তার অভিমত জানতে চায়। সে জানতো মুহাম্মদ মুস্তফার কারণে খোদেজা আত্মহত্যা করে নি। কিন্তু সে সত্য কথা বলে নি। কারণ, সে রাগ করেছিল মুহাম্মদ মুস্তফার ওপর। কেননা, খোদেজার মৃত্যুতে তার মনে কোন অনুতাপ ছিল না ; ছিল না সমান্য স্নেহ-মমতা বা বিয়োগব্যথা। সে জন্যেই কথক-১ মুহাম্মদ মুস্তফাকে বলেছিল, ‘কি করে বলি ? আমি তখন বাড়ি ছিলাম না।’ এই উত্তর খোদেজার আত্মহত্যা সম্পর্কে হ্যাঁ বা না কোন জবাব নয়, তবু এতে মুহাম্মদ মুস্তফার মনে স্পষ্ট ধারণা জন্মেছিল যে, খোদেজা আত্মহত্যাই করেছিল। কথক-১ জানত না তার সত্য না বলার ফলে কি হবে মুহাম্মদ মুস্তফার পরিণতি। সে বুঝতে পারলে হয়তো সত্য কথাই বলতো ; সে জানতো না মুহাম্মদ মুস্তফা অতল গহ্বরের প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। ‘পরদিন তখনো সূর্য ওঠেনি, এমন সময়ে মুহাম্মদ মুস্তফার মা আমেনা খাতুনের মর্মান্তিক আর্তনাদ’ শোনা গেল ; বাল্যকালে যে তেঁতুলগাছের তলার একটি অদৃশ্য সীমারেখা সে পার হয়েছিল সেই গাছেই ঝুলতে দেখা গেল মুহাম্মদ মুস্তফার নিষ্প্রাণ দেহ। ‘খোলা চোখ। সে চোখ শ্যাওলা-আবৃত ডোবার মত ক্ষুদ্র পুকুরে কী যেন সন্ধান করছে’। মুহম্মদ মুস্তফার মৃত্যু প্রসঙ্গে একজন সমালোচক বলেছে :

নদীর কান্নার অদ্ভুত আওয়াজ, কুমুরডাঙ্গার মানুষের ভীতি, অসহায় বোধ, চরম দূর্যোগের আশঙ্কা প্রভৃতির মাধ্যমে উপন্যাসের পরিণাম ঘনীভূত হয়ে উঠে। সেই ঘনীভূত পরিণাম মুহাম্মদ মুস্তফার আত্মহত্যা।

অন্য একজন সমালোচক মুহাম্মদ মুস্তফার মৃত্যু সম্পর্কে মনে করেন, ‘কুমুরডাঙ্গা শহরের সব লোক যে বিচিত্র কান্না শুনেছিল, তার উৎস খোদেজা, তার জন্য দায়ী মুস্তফা- এ চিন্তাই মুস্তফাকে আত্মহত্যার পথে ঠেলে দিলো।’

লেখক পরিচিতি :

ডক্টর মোহাম্মদ  তাজুদ্দিন আহম্মেদ পিরোজপুর জেলার নেছারাবাদ থানার সোহাগদল গ্রা‌মে  জন্মগ্রহণ  করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে এম.ফিল ও পিএইচ.ডি. ডিগ্রি লাভ করেন।