ছোটগল্প

রূপকথা

মাহমুদা আকতার

সকালে ঘুম থেকে উঠার পর নিনির প্রধান কাজ হলো চিরকুট খুঁজে বের করা। রাফি অফিসে যাওয়ার আগে রোজ নিনির জন্য একটা চিরকুট লুকিয়ে রেখে যায় যেখানে দারুণ সব কথা লেখা থাকে। আর নিনিকে তা খুঁজে বের করতে হয়। আজ কিন্তু নিনির খুব বিরক্ত লাগছে। ইতিমধ্যে সম্ভাব্য সব জায়গায় খুঁজে দেখা শেষ। ডাইনিং টেবিল, ড্রেসিং টেবিল, কিচেনের ডিব্বাডাব্বি। না, কোথাও নাই। তবে কী সে আজ চিরকুট লিখতে ভুলে গেল! দূর যাকগে। নিনি ওয়াশরুমে যায় এবং ওয়ালর‌্যাক থেকে টুথপেস্টের টিউবটা নেয়ার সময় সে পেয়ে যায় কাঙ্খিত জিনিসটি। এটা সে রেখেছিলো টিউবের নিচে বেশ যত্ন করে। যে কারণে এটায় কোনো পানি লাগেনি। আজকের চিরকুটে লেখা:‘তোমাকে ভালোবাসতে-বাসতেই একদিন মরে যাব।’ নিনি চিরকুটটা নিয়ে ফাইলে রেখে দেয়। এ নিয়ে মোট ২৪০টি জমা হলো। সে একটা স্পাইরাল বুকে সাঁটিয়ে রাখে সবগুলো। মাঝে মাঝে স্পাইরাল বুক খুলে পড়ে নেয় চিরকুটগুলো। ভারি মজার মজার কথা লেখা আছে কোনো কোনোটায়। একবার রাফি লিখেছিলো: ‘তুই একটা ধানি মরিচ।’ আর একদিন লিখেছিলো, ‘সুচেতনা, তুমি এক দূরতম দ্বীপ।’ লোকটার মাথার স্ক্রু একটু ঢিলা আছে। নইলে এমন আজগুবি কাণ্ড কেউ করে। বিয়ের পরদিন থেকেই চলছে এই চিরকুট লেখা। আরো কত পাগলামি যে করে! রাফি এরকম উল্টাপাল্টা কাণ্ড করে বলেই না এখনও ওদের সম্পর্ক এতটা রোমান্টিক আছে। নইলে তো বিয়ের মেহেদি শুকাতে না শুকাতেই ম্যারমেরে হয়ে যেত। আজ নিনি নিজেও রাফির পকেটে একটা চিরকুট গুঁজে দিয়েছে। তবে এই কথাটা ওকে সরাসরি বলা যাবে না, একটু নাটকীয়তার আশ্রয় নিতে হবে। স্পইরাল বুকে চিরকুটটা রাখার পর মোবাইলের বাটন টেপে নিনি।

-হ্যালো, কি ব্যাপার, কইতরির মা, আজ যে সকাল সকাল সোয়ামিরে মনে পড়লো।

-সাধে কি আর মনে পড়ছে। গ্যাদার বাপ, আজ যে আপনি ওয়ালেট বাসায় রেখে গেছেন টের পেয়েছেন!

-কি বলো? ওয়ালেট ঘরে ফেলে আসছি!

-জ্বি জনাব। দয়া করে পকেটটা একবার চেক করে দেখুন। তো নিনির কথা শুনে দ্রুত পকেটে ঢোকায় রাফি। সঙ্গে সঙ্গেই সে চিরকুটটা পেয়ে যায় সে। নীল রংয়ের একটা প্যাডের কাগজ ফুলের মত কেটে বানানো হয়েছে চিরকুট। আর এতে লেখা, ‘আজ তোমাকে আমি পৃথিবীর সবচে’ সুন্দর রূপকথাটা শোনাব। যা শোনার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকে প্রতিটি পুরুষ।’

এই চিরকুট পাওয়ার পর রাফির অফিস মাথায় ওঠে। সে দ্রুত নিনিকে ফোন করে বলে,‘জলদি রেডি হয়ে নাও। আমি পাঁচ মিনিটের মধ্যে আসছি। আজ সারাদিন ঘুরবো। নিনিকে কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ দেয় না সে।

দুই/

ওদের ঘুরতে যাওয়া মানে শুধুই ঘোরাঘুরি। কোনো শপিংমল, ফাস্টফুড বা চাইনিজে যায় না ওরা। ওরা শহর ছাড়িয়ে অনেক দূরে চলে যায়। হয়তো নতুন জায়গা খুঁজে বের করে রাফি। তারপর ছন্নছাড়া যাযাবরদের মত ঘুরে বেড়ায় সারাদিন ধরে, দুটিতে মিলে। আজও এর ব্যতিক্রম হয়নি। রাফির বাইকটার পিছনে বসে ওকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে নিনি। আর রাফি তার বাইকটাকে ছুটিয়ে দেয় কোনো গন্তব্যহীন গন্তব্যের দিকে। নিনি ওর বাইককে বলে পঙ্খীরাজ ঘোড়া। নেভি ব্লু রঙের ইয়ামাহা বাইকটা রাফির খুব প্রিয়। নিনি আজ পড়েছে সবুজ জমিনে লাল-নীল ফুল তোলা একটা বাটিকের সুতি শাড়ি। সঙ্গে নীল-লাল প্রিন্টের ব্লাউজ। মুখে হালকা ফেসপাউডার, লিপিস্টিক আর দু’চোখে কাজল। এই অল্প সাজেই ওকে দারুণ লাগছিলো। রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে ফুচকা খায় নিনি। আর তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে রাফি। ঝালে ওর নাক মুখ লাল হয়ে গেছে। ও মুখ সরু করে শ্বাস নেয়। তখন নিনিকে এত অপরূপ লাগে যে রাফির চোখ ফেরাতে ইচ্ছে হয় না। এরপরও কোনো রোমান্টিক কথা আসে না রাফির। কেবল হাতের সানগ্লাসটা দুলাতে দুলাতে দুষ্টমী করে গান গায়, ‘রূপ দেখে বলবো কি ভাষা খুঁজে পাই না।’ রাফির সঙ্গে থেকে থেকে নিনিও ভালো রসিকতা শিখে গেছে। ও বলে, ‘আমি খুব ভালো ভাষা জানি, কিনবা গ্যাদার বাপ?’

-টাকা নাইরে বউ, ওয়ালেট বাসায় ফেইলা আসছি। বাকি দিবি?

নিনি এবার হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে।

ওরা সারা দুপুর একটা ছইওয়ালা নৌকায় করে পদ্মার জলে ঘুরে বেড়ায়। দুপুরে একটা নৌকা রেস্টুরেন্টে ভাত খায়। ইলিশ মাঝের ঝাল- ঝাল ঝোল, শুটকির ভর্তা আর পাতলা মসুরের ডাল দিয়ে। আগে হলে নিনি এইসব জায়গায় খেতে পারতো না। কিন্তু গত আট মাস রাফির সঙ্গে থাকতে থাকতে ওর সব অভ্যাস হয়ে গেছে। সব ছুটির দিনেই ওরা সারাদিন ঘুরে বেড়ায়। অনেক সময় ঘোরার জন্য রাফি দিন কয়েকের জন্য অফিস ছুটি নেয়। তখন ওরা যায় ঢাকার বাইরে। তবে ওরা কোনো পরিচিত বা কমন টুরিস্ট স্পটে ঘুরে না। ওরা যায় সব অপরিচিত জায়গায়।

বিকেলে নিনিকে নিয়ে একটা কচুরিপানায় ভর্তি খালের কাছে আসে রাফি। খালের ওপর একটা পুরনো বাঁশের সাঁকো। খালটার আশেপাশে কোনো লোকালয় নাই। তারপরও সাঁকোটা কেন তৈরি করা হয়েছে নিনি ভেবে পায় না। রাফি বলে, হয়তো আগে এখানে কোনো লোকালয় ছিলো। এখন তা উঠে গেছে।

কিন্তু এ নিয়ে বেশি ভাবতে রাজি নয় রাফি। সে সাঁকোতে বসে নিজের দুই পা নিচের জলাশয়ের ওপর ছড়িয়ে দেয়। এরপর আদুরে গলায় নিনিকে ডাকে, এখানে আস, প্রজাপতি মেয়ে।

-ইস, আমার ভয় করে।

-আরে আমার হাতটা ধরে ধরে আসো তো। ভয় কি, আমি আছি না!

তবুও নিনার ভয় কাটে না। রাফি এসে ওকে ধরে ধরে নিয়ে যায়। সাঁকোর উপরের বাঁশটা ধরে বসে থাকে দু’জন। কী অদ্ভুত নির্জন জায়গাটা! নিচে কচুরির ফুলগুলোকে ঘিরে জটলা জমিয়েছে ঘাসফড়িং আর প্রজাপতির দল। ওদের দলে যোগ দিয়েছে কিছু ভূঁইফোড় পাখি। টু-টু টুইট করে ডাকে আর এখান থেকে ওখানে উড়ে বেড়ায়। এই জায়গাটা নিনির পরিচিত মনে হয়। এরকম একটা জায়গাতেই ওকে প্রপোজ করেছিল রাফি। তবে সেখানে কোনো সাঁকো ছিলো না। সেদিন নিনির সামনে হাঁটু গেড়ে বসে বলেছিলো, ‘এই ঘুঘু পাখি, তুই আমার বউ হবি? আমরা দু’জন একসঙ্গে বসে বৃষ্টি দেখব। পৃথিবীর সবচে সুন্দর জায়গাগুলোতে তোকে নিয়ে যাব। আমরা শুধু ঘুরেই বেড়াব পাখির মত করে।’

নিনা পুরোপুরি হতভম্ব হয়ে গেছিলো সেদিন। কারণ এমন একটা জংলি পরিবেশে কেউ যে কোনো নারীকে প্রপোজ করতে পারে তা ওর জানা ছিলো না। আর ও নিজে এ নিয়ে যেসব কল্পনা করছে তাতে কোথাও এমন স্থান ছিলো না। তাই বলে রাফিকে মেনে নিতে ওর দেরি হয়নি। সেদিন দুষ্টুমি করে কেবল বলেছিলো, ‘আগে একশ’ আটটা লালপদ্ম পাই। তারপর না বলবো।’

-লালপদ্ম তো নাই। নীলফুলে হবে? -এই বলে কচুরি ফুল তুলতে শুরু করেছিলো মানুষটা। আর কচুরি ফুল দিয়ে কেউ কখনও প্রপোজ করে এমন কথা কে কবে শুনেছে? কিন্তু নিনির জীবনে তাই হয়েছে।

জলাশয়ের নিসর্গতা দেখতে দেখতে কোথায় যেন হারিয়ে যায় নিনি। আর ঠিক তখনই বাতাস হয়ে যায় রাফি। ওর কানে কানে বলে, ওগো হাঁসকুড়ানি ওলবুনুনি মেয়ে, আমার রূপকথা কোথায়?

-ইস, এটা বুঝি রূপকথা শোনার সময় হলো! আগে আমাকে একটা কাসার থালার মত চাঁদ আর কদম ফুলের মতো কিছু তারা এনে দাও। তবেই না শুরু হবে  রূপকথা।

-এখন চাঁদনি রাত কোথায় পাব! একশ’ আটটা নীলপদ্ম চলবে, টুনটুনির মা।

-নাগো, ওসব কিচ্ছু লাগবে না। তুমি আর একটু অপেক্ষা করো না গো ময়নার বাপ। নীল আসমানে চাঁদটা আসতে দাও তো!

তিন

ফেরার পথে রাফি তার ঘোড়ার গতি বাড়িয়ে দিলে খুব ভয় হয় নিনার।

-প্লিজ, একটু কমাও না।

-তার আগে তুমি বলো ভালোবাসো।

-ভালোবাসি ভালোবাসি। এবার তো স্পিড কমাও।

-তার আগে আমাকে জড়িয়ে ধরো না।

নিনা পিছন থেকে রাফিকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে বলে, ‘দোহাই লাগে লক্ষীটি, এবার তো একটু কমায়। এত স্পিড আমার একটুও ভাল্লাগছে না। মনে হচ্ছে রাস্তায় পড়ে যাব। এ্যাই কথা শুনছো না কেন, তাহলে আমি কিন্তু আর কখনও তোমার হোন্ডায় উঠবো না।

-নিনি, আমার খুব গরম লাগছে। তুমি আমার হেলমেটটা খুলে ফেলো। হ্যা, এটা এবার নিজের মাথায় পড়।

-আচ্ছা নিনি, তোমার রূপকথা তো শোনা হলো না। এবার তুমি আমার একটা কথা শোনো। আমাদের রূপকথাকে খুব যতেœ রেখো।

গত আট মাসের মধ্যে আজই প্রথম নিনি সকালে ঘুম থেকে ওঠে চিরকুট খোঁজে না। ও কেবল চুপচাপ বসে থাকে। নিনি কাঁদে না। কথা বলে না। ও সামনে থেকে খবরের  কাগজটা সরিয়ে রাখে। পৃথিবীতে যত আশ্চর্য ঘটনা কেবল ওর জীবনেই কেন ঘটে! সঙ্গের মানুষটা চলে গেলো আর ও কিনা দিব্যি বেঁচে রইলো! এটা কী মিরাকল নয়! না, এটা মিরাকল কেন হবে? সঙ্গের মানুষটা চাইছিলো বলেই না ও বেঁচে আছে। রাফি তো জানতো ওর মোটরসাইকেলের ব্রেকফেল হয়েছে। তারপরও নিনিকে একটুও বুঝতে দেয়নি। ওকে নিরাপদে রেখে গেছে ওর রূপকথার জন্য।

#