স্মৃতিগদ্য

সাহিত্য- শিল্পকলার অসামান্য উৎসব

হারুন হাবীব

ভারতের সুপ্রাচীন ভোপাল নগরীতে সাহিত্য ও শিল্পকলার একটি উৎসবে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ আসে গত বছর খানেক আগে। মধ্যপ্রদেশের এই রাজধানী শহরে প্রথমবার যাই ১৯৮৩ সনে, তখন ‘ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ মাস কমিউনিকেশন’ এ সাংবাদিকতায় পোষ্ট গ্রাজুয়েশন ডিগ্রি নিতে বছর খানেক নতুন দিল্লি থাকতে হয়েছিল। কিন্তু এবারের যাওয়াটা খানিকটাই তড়িঘড়ি করে। উৎসব কতৃপক্ষ, অর্থাৎ ‘ভোপাল লিটেরেচার এ্যন্ড আর্ট ফেস্টিভেল’ আমন্ত্রণ পাঠালো একেবারে অন্তিম সময়ে, দ্রুত আমার মত জানাতে হল, এবং কয়েক ঘন্টার মধ্যে প্লেনের টিকিট পৌঁছে গেল। ভ্রমণ-সূচি দেখে বুঝতে অসুবিধে হলো না পথ বেশ লম্বা । যাবার পথে প্রথমে যেতে হবে মুম্বাই, সেখান থেকে প্লেন বদলিয়ে ভোপাল। ফিরতে পথে আসতে হবে আবার দিল্লি হয়ে।
ভারতের ভিসা না থাকলেও উৎসব আয়োজকদের হস্তক্ষেপে দ্রুতই সেটা জুটল। ভারতীয় হাই কমিশন সহায়তা করল। ১২ জানুয়ারি দুপুরে রওনা দিয়ে মুম্বাই হয়ে খানিকটা রাতেই পৌঁছালাম ভোপালে। দেখলাম, অনেক বদলেছে ইতিহাসের এই নগরী- সেই আগের চেহারা নেই। ১৯৮৪ সালে ইউনিয়ন কার্বাইড- কীটনাশক উৎপাদনকারী কারখানা থেকে মারাত্মক গ্যাসের দ্রবন বেরিয়ে আসায় বিশ্বের ইতিহাসে সবচাইতে বড় শিল্প বিপর্যয় ঘটে এই নগরীতে। মারাত্বক বিষক্রিয়ায় মারা যায় হাজার কয়েক মানুষ । কিন্তু ভোপাল সে বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠেছে। ভোপাল এখন বিস্তীর্ণ সবুজ ও পরিপাটি নগরী। প্রায় সব প্রান্তে চোখ জোড়ানো হৃদ, আকর্ষণীয় ছোটছোট পাহাড়। এমন পরিচ্ছন্ন শহর খুব একটা চোখে পড়েনা।
মধ্যপ্রদেশের এই শহরটার প্রধান বিশেষত্ব অপরূপ অগনিত হৃদ, যার কিছু প্রাকৃতিক কিছু কৃত্রিম । শুধু ভারত কেন, অন্য কোথাও এমন শান্ত জলাধারের সমাহার দেখা যাবে না। এককালে ভোপাল প্রাচীন ভারতের রাজ্য ছিল, ব্রিটিশ আমলে নবাবদের ‘প্রিন্সলি ষ্টেট’ হয়েছে। সেকালের ঐতিহ্যবাহী পুরনো ইসলামি স্থাপনাগুলির আজও কিছু কিছু স্বগৌরবে আছে, আছে তাজ-উল-মসজিদ ও তাজমহল প্রাসাদ – ইত্যাদি।
লোককাহিনি আছে, ১১ শতকের রাজা ভোজ রাজ্যটি প্রতিষ্ঠিত করেন। অন্য কাহিনিতে বলা হয়েছে এর নামকরণ হয়েছে ভোপাল রাজার নামে। সেই রাজা ভোজ ছিলেন কুষ্ঠরোগী। বৈদ্যরা ৩৬৫টি নদীর পানি দিয়ে একটি হ্রদ তৈরি করে তাতে প্রতিদিন তাকে গোসল করার পরামর্শ দেন। যেমন কথা তেমন কাজ। অল্পদিনের মধ্যে একটি বিশাল হ্রদ নির্মিত হল, রাজা তাতে স্নান করতে লাগলেন। সেই থেকে লোকজনে হৃদটিকে ভোজ তাল [বা ভোজের হ্রদ] বলতে শুরু করল। ধীরে ধীরে নাম বদলে হল ভোজপাল এবং অবশেষে ভোপাল।
তবে লোককাহিনি যাই থাক আধুনিক ভোপাল গড়ে ওঠে দোস্ত মোহাম্মদ খানের (১৬৬০-১৭২৬) হাতে। মুঘল সেনাবাহিনীর পশতুন এই সেনাপতি নিজের শৌর্যবীর্যে এক সময় ভোপালের সঙ্গে আরও কয়েকটি রাজ্য যুক্ত করেন। ১৭২০-এর দশকে তৈরি করেন ফতেহগড় দুর্গ । ১৮১৮ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে চুক্তির পর ভোপাল ভারতের প্রিন্সলি ষ্টেট বা যুবরাজীয় রাজ্যে পরিণত হয়। আরও অবাক হবার মতো যে, ১৮১৯ এবং ১৯২৬ সালের মধ্যে, চারজন বেগম বা নারী প্রবল প্রতাপে শাসন করেন ভোপালকে। এদের মধ্যে দুর্দান্ত প্রতাবশালী ছিলে কুদসিয়া বেগম । তিনি ছিলেন প্রথম নারী যিনি ভোপালকে শাসন করেন ১৮১৯ এবং ১৮৩৭ পর্যন্ত। এরপর আসেন তারই কণ্যা সিকান্দার । ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের সময় সিকান্দার ব্রিটিশদের সমর্থন করায় তার বিস্তর সমালোচনা হয়। কিন্তু তিনি ইংরেজের আথিপত্য থেকে বেরিয়ে যেতে পারেন নি। ফলে ইংরেজের কাছ থেকে বহু ভাবে তিনি পুরস্কৃতও হন।
মনে আছে, ভারতের মাটিতে প্রথম সাহিত্য সম্মেলনে যাই ১৯৯০ সালে। সেবারকার ‘উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাহিত্য সম্মেলন’ এর আসরটি বসেছিল আসাম রাজ্যের সীমান্ত-ঘেঁষা ত্রিপুরার কৈলাশ শহরে। এলাকাটি সিলেটের কমলগঞ্জ-শমশের নগরের গা ঘেঁসা, একমাত্র সীমান্তচিহ্ন ছাড়া তফাৎ করার সুযোগ নেই। বাংলা, অসমীয়, মনিপুরি, ককবরক, মিজোসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ভারতের প্রায় প্রতিটি ভাষার বহু সংখ্যক কবি, লেখক, নাট্যকার, গায়ক, সমালোচক ও অংকনশিল্পীরা এ সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন।


সেবার পড়েছিলাম এক মহা বিপাকে! যতই লাগোয়া সীমান্ত হোক ভিসা ছাড়া তো আর বিদেশ পাড়ি দেওয়া যায় না! কিন্তু আমার পাসপোর্ট ভারতীয় ভিসা নেই। বেলাল ভাই, অর্থাৎ কবি বেলাল চৌধুরী তখন ভারতীয় হাই কমিশনের প্রকাশনা ‘ভারত বিচিত্রা’ পত্রিকার সম্পাদক । তাঁকে ঘিরেই আমাদের প্রায় প্রাত্যহিক আড্ডা। যথারীতি ভারতীয় ভিসা জোগাড় করতে আমরা এই সুহৃদ মানুষটির সহায়তা নিয়ে থাকি। অতএব তড়িঘরি ছুটলাম ধানমন্ডির ৩ নম্বর সড়কে বেলাল ভাইয়ের অফিসে। কাগজপত্র জমা দিলাম। দিন যেতে থাকল। এক সপ্তাহ গেল কিন্তু পাসপোর্ট ফেরত এলো না! এদিকে সম্মেলনের দিনও দোর গোড়ায়! কি করবো বুঝে ওঠতে পারলাম না! শেষমেশ এক রকম ক্ষুব্ধ মনেই শমশেরনগরের দিকে রওনা দিলাম। বর্ডারের ওপারে যেতে পারি না পারি, অন্তত আমন্ত্রণকারীদের বোঝানো যাবে আমার ইচ্ছের কমতি নেই!
ঢাকা থেকে ট্রেন ধরে প্রথমে নামলাম ভানুগাছ ষ্টেশনে । বেশ রাত তখন। কিন্তু দেখলাম রাত গভীরেও অতিথি আপ্যায়ন কম হলো না। ভারতীয় আয়োজকদের বাংলাদেশের বন্ধুরা জনা কয়েক আমাকে নিয়ে তুলল তখনকার উদীয়মান গায়ক সেলিম চৌধুরীর পারিবারিক বাড়িতে। রাতটা কাটিয়ে সকাল হতেই মাথায় আবারও দুশ্চিন্তা- ভিসা নেই পাসপোর্ট নেই- কীভাবে পাড়ি দেবো বর্ডার! মোবাইল ফোন তখনও চালু হয়নি। ভিসা হলো কি হলোনা তা জানতে ঢাকায় ফোন করতে হবে। কিন্তু উপায় কি! হঠাৎ করেই মুসকিল আহসান হল। দলবল নিয়ে রওনা দিলাম মাইল কয়েক দূরের প্রায় পরিত্যক্ত শমশেরনগর বিমান ঘাটিতে। দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের সময় ইংরেজ এই বিমান ঘাঁটি বানিয়েছিল । আর মেরামত হয়নি। খা খা করছে রানওয়ে । ঘাস গজিয়েছে। অনেকগুলো ছাগলও দেখা দেখা গেল রানওয়েতে। আমরা ওখানে গিয়ে পৌঁছলাম কারণ স্থানীয়রা জানাল ঘাটি সচল থাক না থাক ঢাকার সঙ্গে এখান থেকে একটা টেলিফোন সুবিধে পাওয়া যেতে পারে।
দেশে তখন জেনারেল এরশাদ বিরোধী প্রবল গণআন্দোলন- শহর গুলিতে লাগাতার হরতাল চলছে। চারদিকে শ্লোগান- স্বৈরাচার নিপাত যাক। যা হোক, শমশেরনগর বিমান ঘাঁটি থেকে আমার ঢাকার বাড়িতে ফোন করে জানা গেল, ভিসার জোগাড় হয়েছে। লোক মারফত পাসপোর্ট বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছেন বেলাল ভাই। সুখবরটা শোনা মাত্র একটা গাড়ি ভাড়া করে দুই তরুণ ঢাকার দিকে রওনা দিল। যারা গেল তারা রাতের মধ্যেই একই গাড়িতে ফিরে আসবে-
কথা ছিল এমনই। কিন্তু পরের দিন সকালেও তাদের খোঁজ মিলল না! হরতালে হয় ওরা আটকা পড়েছে নয় কোনো সড়ক দুর্ঘটনায় পড়েছে- এসবের কিছুই জানা গেলনা! অতএব স্থানীয় কয়েকজন অনেকটা জোর করেই আমাকে নিয়ে হাঁটতে শুরু করল বর্ডারের দিকে। সঙ্গে সঙ্গীতশিল্পী সেলিম চৌধুরী। যা হোক কয়েক ঘন্টা পায়ে হেঁটে, বিডিআর এর জেরা ও নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে এক সময় গিয়ে আমরা পৌঁছলাম কৈলাশ শহরের গা-ছোঁয়া বাংলাদেশের মাটিতে। ওপার থেকে মাইক্রোফোনে সম্মেলনের প্রচার শুনতে পাচ্ছি। কিন্তু ভিসা নেই অতএব যেতে পারছি না! খবর পেয়ে ওপার থেকে কিছু অতি উৎসাহী আয়োজক বিএসএফ প্রহরীদের বলে-কয়ে বাংলাদেশের মাটিতে ঢুকে গেল। সম্মেলনের উদ্বোধন করবো আমি। অতএব ওরা আমাকে ওপারে নিতে জেদ করা শুরু করল। কিন্তু ভিসা ছাড়া বর্ডার পাড়ি দিতে আমি নারাজ। দেখতে দেখতে কয়েক ঘন্টা গেটে গেল। বিকেলের দিকে ঢাকা থেকে পাসপোর্ট হাতে হন্তদন্ত হয়ে দুই তরুণ এসে পৌঁছাল। এবং আমি ও আরও কয়েকজনের প্রবেশ ঘটল কৈলাশহরে। সে উৎসবেই প্রথম পরিচয় ঘটল কিংবদন্তি সঙ্গীত শিল্পী ভুপেন হাজারিকার সঙ্গে।
তবে কৈলাশহরের সঙ্গে ভোপালের উৎসবটির বেশ খানিকটা তফাৎ লক্ষ করেছি। ত্রিপুরা ও আসামের বাংলাভাষী বন্ধু ও ভক্তদের অনেকেই কৈলাশহরে এসেছিলেন সেবার। অতএব আড্ডার কমতি ছিল না। কিন্তু কেন জানি না ভোপালের উৎসবে এমন একজনেরও দেখা মিললো না! একমাত্র ভারতীয় এবং যে বাঙালি লেখকের দেখা মিলল, সেই অনুরাধা রায়ও ইংরেজি ভাষার লেখক । আলাপ পরিচয় হতে জানলাম বাঙালি হলেও অনুরাধা জন্মেছেন হায়দ্রাবাদে।


তবে বাংলা ও প্রায় বাঙালি বর্জিত হলেও জানুয়ারির ১৩ থেকে ১৫ তারিখের ভোপাল উৎসবটি নানা দিক থেকে আমাকে আকর্ষণ করেছে। বৃহৎ ভারতের প্রায় ৫০০ সুপরিচিত চিন্তাবিদ, কবি, গল্পকার, উপন্যাসিক, গবেষক, গায়ক, চিত্রকর, সম্পাদক, মানবাধিকার নেত্রী, প্রকাশক ও সমালোচক যোগ দেওয়ায় উৎসবটি রীতিমতো প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
প্রায় সর্বভারতীয় এই উৎসবে হিন্দির প্রভাব লক্ষ করা গেলেও সবকিছু ছাপিয়ে ওঠে ইংরেজি। যারা যোগ দিয়েছেন তাঁরা প্রায় সকলেই ইংরেজিতে লেখেন, কেবল সাহিত্য নয় সমাজ-সংসার,রাজনীতি,পরিবেশ- সবকিছু নিয়ে। স্বভাবতই যে সব গুরুত্বপূর্ণ বই নিয়ে আলোচনা হয়েছে তার সবগুলো সাহিত্যের নয়।
সাহিত্যের বাহন হয়ে ভাষা লেখকের সৃষ্টিকে প্রকাশ করে। তবে এই ভাষা জনপদ ভেদে ভিন্ন হয়। সে কারণে এক ভাষার সাহিত্য কিংবা বইপুস্তক অন্য ভাষার মানুষের গোচরে আনতে প্রয়োজন হয় কোনো সেতু-ভাষার- যার বিকল্প ইংরেজি ছাড়া নেই। অনুবাদ বা ভাবানুবাদ যাই বলিনা কেন, এ ছাড়া উপায়ও নেই। ইংরেজিভাষীদের প্রাচীন ও আধুনিক সাহিত্য আছে, যা বিশ্বনন্দিত।
তবে অন্য ভাষাভাষীর লেখকরাও ইংরেজিতে সাহিত্য রচনা করেন। ভারতে বাংলা, তামিল, উর্দু, হিন্দি, তেলেগু, কান্নারি, ওড়িয়া, অসমীয়সহ বহু ভাষার গর্বিত সাহিত্য আছে, কিন্তু দেশটিতে সাহিত্য রচনা অথবা সার্বিক জ্ঞানচর্চার মূল মাধ্যম ইংরেজি। এটি ভারতের বিশ^গ্রাহ্যতা বাড়িয়ে দিয়েছে।
ভোপালের সাহিত্য ও শিল্পকলার অসামান্য আসরটির আয়োজন করা হয়েছিল নগরীর ‘ভারত ভবনে’। অত্যাধুনিক এই ‘ভারত ভবন’ একদিকে যেমন অনুপম স্থাপত্যশিল্প, অন্যদিকে গোটা ভারতে শিল্পকলার পূরধা প্রতিষ্ঠান। ১৩ জানুয়ারি বিকেলে পন্ডিত উমাকান্ত গুন্ডেচার রাগের মধ্য দিয়ে উৎসবের উদ্বোধনী ঘটল। এরপর শুরু হল ভারতখ্যাত শিল্পী পদ্মশ্রী ভুলা মন্ডের শিল্প প্রদর্শনি। প্রথম দিনেই ভারতীয় মানচিত্রের ক্রমাগত পরিবর্তনের ওপর বক্তব্য রাখলেন বিখ্যাত পন্ডিত ড. সঞ্জিভ চোপড়া।
আমার নিজের পর্বটি ছিল শেষ দিন। বলতে হয়েছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, সাহিত্যচর্চা, বই-প্রকাশ ইত্যাদি নিয়ে। প্রাচীন ভারতের একটি সংস্কৃত বাক্য আছে- ‘ভাসুধাইবা কুটুমবাকাম’ – যার অর্থ গোটা বিশ্ব এক পরিবার। বিমস্টেক, বঙ্গোপসাগরের পাড়-ঘেঁসা দেশগুলির সহযোগিতা সংস্থা, যার মূল উপাত্বও এক বিশ^, এক পরিবার, এক ভবিষ্যত- কথা বলেছি সে সব নিয়েও। আমব্রিম জায়েদীর উপস্থাপনায় এ পর্বে আরও কথা বলেছেন বিমসটেক বিশেষজ্ঞ রাকেশ তিওয়ারী।
তিনদিন ধরে বিস্তর সময় পেয়েছি কবিতা, নাটক,গল্প-উপন্যাস, শিল্পকলা, রাজনীতি, যুদ্ধ, পরিবেশ ও প্রকাশনাসহ নানা বিষয়ে ভারতীয় খ্যাতিমানদের আলোচনা শোনার। উৎসবের সকল অতিথিদের রাখা হয়েছিল জেহান নুমা প্যালেস নামের ঐতিহ্যবাহী হোটেলে। আমার ঠিক পাশের রুমে ওঠেছিলেন দক্ষিণ ভারতের সঙ্গীত-নাটক একাডেমি ও কালীদাস সম্মাননাধারী কিংবদন্তি নৃত্যশিল্পী লক্ষী বিশ্বনাথন। অনেক বয়স তাঁর- চেন্নাই থেকে এসেছেন। লক্ষী বিশ্বনাথন উৎসবে জানলেন, কী কঠিন শ্রম দিয়ে তিনি তাঁর বহুলালোচিত গবেষণাগ্রন্থ ‘দেবদাসী’ লিখেছেন। প্রাচীন ভারতের মন্দিরগুলিতে দেবদাসীদের জীবনেতিহাস নিয়ে অসামান্য গ্রন্থ সেটি। ভাবতে কষ্ট হয়, ঢাকায় পৌঁছতে পৌঁছতেই খবর পেলাম ভোপাল থেকে চেন্নাইয়ে পৌঁছার পর পরই এই কিংবদন্তি শিল্পী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন।
সংস্কৃতি ও পরিবেশ বিষয়ে একটি বড় ভারতীয় সমিতি উৎসবটি আয়োজন করে। তবে সুবিশাল খরচের অর্থ জুগিয়েছে দেশের শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলি। ভারতের শিল্পপতিরা কীভাবে সাহিত্য ও শিল্পকলার পৃষ্টপোষকতা করেন এই উৎসবে না এলে আমার জানা হতো না। উৎসবটির মূল কারিগর শ্রী রাঘব চন্দ্র ছিলেন এককালের কেন্দ্রিয় ভারত সরকারের সচিব। অনেকগুলো উপন্যাস তাঁর। এত বড় একটি মহাযজ্ঞ তিনি কতটা দক্ষতার সঙ্গে পাড়ি দিয়েছেন, তা না দেখলে কেউ বুঝবেন না!
আমার বিশ্বাস, সাহিত্য ও শিল্পকলার এই উৎসবটি ভারতীয় শিল্পসাহিত্য ও জ্ঞানচর্চার একটি পরিস্কার চিত্র দেবে সবাইকে। একই সঙ্গে দেশটির নতুন প্রজন্ম কীভাবে সেই চর্চার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, কীভাবে তারা মুক্ত সমাজের ঝান্ডা উচিয়ে সামনে এগিয়ে আসছে, সেটিও আন্দাজ করা যাবে।
তবে হুজুগের ব্যাপারটি যে কেবল বাঙালির চরিত্রেরই বৈশিষ্ট – সেটিও সত্যি নয়। সাহিত্য ও শিল্পচর্চা হুযুগ বা প্রতিযোগিতার বিষয় নয়, নিছক ব্যবসাও নয়। কিন্তু এখানেও প্রতিযোগিতা কম লক্ষ করা গেল না! বড়-ছোট অনেক প্রকাশনা সংস্থার ষ্টল বসেছে। কমবেশি বই বিক্রি হচ্ছে। চটকদার বইই বেশি। ইউরোপে ব্যাপকভাবে নন্দিত এবং ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বহুলালোচিত কৃতী ভারতীয় অভিনেতা কবির বেদী উৎসবে মোড়ক উম্মোচন করলেন তাঁর আত্মজীবনি ‘দ্য স্টোরিস আই মাষ্ট টেল’ এর হিন্দি সংস্করণ। দেখলাম শত শত তরুণ-তরুণী বইটি কিনছে এবং স্বাক্ষর নিতে লম্বা লাইন দিয়েছে। নারী-পুরুষ ও তৃতীয় লিঙ্গের সমঅধিকারের বিশ্বজোড়া প্রবক্তা কবি কালকি সুব্রামানিয়ামের সাহসী কবিতা আমার আগে পড়া হয়নি। হিজড়া সম্প্রদায়ের এই মানুষটি কতটা সাহসে কথা বলেন, তা আমার আগে জানা ছিল না।
সব মিলিয়ে ‘ভোপাল লিট এ্যন্ড আর্ট ফেষ্ট’ এ মন্দ কাটল না।

##