সংকলন =

সাহিত্যিকের কড়চা

শওকত ওসমান

অতীত-স্মৃতি, ইতিহাসের আলোয় :
কলকাতা থেকে প্রকাশিত মাসিক ‘মোহাম্মদী’ পত্রিকার পৌষ, ১৩৪৭ সংখ্যায় পাঁচটি আলোকচিত্রসহ ‘সাহিত্যিকের কড়চা ’ শিরোনামে একটি অসাধারণ ভ্রমণকাহিনী প্রকাশিত হয়েছিল। নানা কারণেই এই ভ্রমণকাহিনী এবং আলোকচিত্রগুলোর ঐতিহাসিক মূল্য রয়েছে বলে মনে করি । আলোকচিত্রে রয়েছেন স্বনামখ্যত সব সাহিত্যিক- যাদের কয়েকজন আবার সাংবাদিক হিসেবেও প্রসিদ্ধ। এখানে দেয়া পান্ডুয়ার বিখ্যাত মিনারটির আলোকচিত্র তুলেছিলেন সুসাহিত্যিক- মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী খাঁ। আর ‘সাহিত্যিকের কড়চা’ যিনি লিখেছিলেন, তিনি আমাদের কথাসাহিত্যের অন্যতম প্রবাদ পুরুষ শওকত ওসমান । এই লেখা তাঁর কোন গ্রন্থভুক্ত হয়েছে কি না, জানি না। যাহোক লেখাটি আপনাদের ভাল লাগতে পারে বলে মানব-এ দিলাম =

‘বুলবুল’ উড়ে গেছে। কিন্তু ‘বাহার’ (১) আজো অচলায়তন। আর, আপত্তি কী তাতে? ইরাণের কবিদের কাছে ওই দুটো চিজ্ একই অনুসঙ্গে জড়াজড়ি করত। আমরা না হয় বিংশ শতাব্দীতে একটু হেরফের।আরো অনেক রকমের হেরফের। বাহার- ঐ গুণবাচক নির্বস্তুকতায় আমরা সন্তুষ্ট নই। তাই (পুতুলপূজার চালে) গুণবাচককে নাম-বাচকের লেফাফায় পুরতে চাই। কল্পনা করুন- বাহার শব্দের সাথে একটা জ্যান্ত মানুষের মুখ-যার চোখ নড়ে- জিব্ ডিগবাজী খায়- ভুরুটা মিনিটে মিনিটে ‘উঠ্ বস্’ কসরৎ দেখায়। আর একটু বাকী আছেঃ ঠোঁটের উপর আঁকুন বড় প্রজাপতি-গোঁফ; মুখটা গোলগাল, পায়জামা-আচকান আর গান্ধী টুপিতে ঢেকে কতকটা দাড়ীহীন খান আবদুল গফ্ফার খাঁ (যৌবনে) বলে ধরে নিন- যার নাকটা তির্য্যক্গতিতে নেমে শেষ হওয়ার আগে জাঁদরেলের হল্ট এই হুকুম-শোনা মার্চরত বেসামাল সিপায়ের মতো হঠাৎ নিজের জায়গাটা ঘুলিয়ে ফেলেছে। মুখাবয়বের দিকটা মোটামুটি এই। বাকী ধড়টায় হাত চালানোর অধিকার আমাদের নেই।
মুশ্কিল। নামও একটা চাই। নচেৎ কোষ্টি অপূর্ণ থাকে। খান আবদুল গফফার খাঁ- আগে থেকে হাঁকড়েছেন- তিনি পেশোয়ারী। কাছাকাছি কাবুল-আর আমানুল্লার পিতৃদেব (নামটা বুকে আছে, মুখে আসছে না)- হ্যাঁ, মনে পড়েছে- হবিবুল্লা। আসুন, ঐ নামেই আমরা বাহারকে মানুষের মতো দেখি (নামবাচক শব্দটা লক্ষ্যণীয়)।
সব পূর্ণ হল। এখন চাই একটা খেতাব। ধরুন খেতাবটা এই ঃ- সম্পাদক, বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতি। তারপর?
তারপরই আমাদের কড়্চা শুরু। গোবিন্দদাস শশীমুখীর ভয়ে মহাপ্রভুর সাথে দেশবিদেশ জরীপ করেছিল, আর কড়চা লিখেছিল। সান্তনার বিষয় আমার শশীমুখী নেই- তবে শ্রী শ্রী মহাপ্রভুর সঙ্গলাভ করেছিলাম। তাঁর কথা আসল জায়গায় খোঁজ করবেন। সেদিন সকালে উঠে দেখি বাহারী-পরওয়ানা বেরিয়েছে ‘আজাদে’র মারফত :-
বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির উদ্যোগে আগামী পয়লা ডিসেম্বর হাজী মোহাম্মদ মোহসেন স্মৃতি-বার্ষিকী উপলক্ষ্যে হুগলী যাওয়া স্থিরীকৃত হইয়াছে। সাহিত্যিকদের সহযোগিতা প্রার্থনীয়।
-মুহম্মদ হবিবুল্লাহ (বাহার)
সম্পাদক, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি।
হুগলী আমাদের সদর। ইমামবাড়া ইত্যাদি প্রায় বৈঠকখানার সামিল। তীর্থ করবার বেশী লোভ ছিল না। তবে এতগুলি মহারথীর সহিত- একটু ভাববার বিষয়। কিন্তু সিদ্ধান্তের ভিত্কে নড়াতে পারলাম না। না- আমি যাব না। সারাটা দিন বাউন্ডুলের মত ঘোরা, আবার ট্যাঁকের কড়ি খসানো-অত হাঙ্গামা আমার পোষাবে না। আরো নানারকম যুক্তিতর্কে মনের এদিক-ওদিক ঝুঁকে-পড়া-ভাবটাকে সোজা করতে লাগলাম।
পয়লা ডিসেম্বর রবিবার। তিরিশে নভেম্বর ‘আজাদ’ অফিসে আমরা কয়েকজন গল্পে মশগুল। হবিবুল্লা সাহেবও সেই আসরে পৌঁছলেন। কোন লৌকিকতা নেই, সোজাসুজি আমার দিকে চেয়ে বললেন, ‘কাল সকালে কখন হুগলী যাচ্ছেন?’
‘হুগলী?’-আমি ভান করলুম। ‘হুগলী-কেন?’
বাহার সাহেব একটা সিগারেট ধরালেন, (একটা বয়’ ডেকে-‘এই পাঁচ পেয়ালি চা লাও’) পরে ধোঁয়া ছাড়ার সাথে সাথে মুখের লাগাম আল্গা [করে] দিলেন ঃ ‘আজাদ পড়েন ত, ও-সব কথা রাখুন। আমরা হাজী মোহসেনের স্মৃতি-উৎসব করতে হুগলী যাব, আপনাকে যেতে হবে।’
আমি নিমরাজী! না-ভেঙ্গে মচ্কানোটা-ই আমার কাছে সোজা মনে হল। বললাম, ‘হুগলী আমি বহুবার গিয়েছি। আর কেন?’
‘আমিও বহুবার গিয়েছি। বহুবার ভাত খেয়েছি, তবু রোজ খাই কেন?’ সম্পাদক সাহেবের গলায় বিদ্রুপাত্মক চিড়। লজিকটা মন্দ নয়। মনের সাথে ‘ডুয়েল’ লড়ে জিতেছিলুম কিন্তু একাধারে (দ্বৈত-সম্পাদক ( বুলবুল ও সাহিত্যসমিতি) ফুটবল খেলোয়াড়, প্রকাশক, অন্যান্য সদগুণের ডুবুরির কাছে পাত্তা পাওয়া দায়।
একবাঁশ জলে পড় পড়লুম। যুক্তিতে হেরেছি, তখন আর উপায় কী। চোখ কানে বুঁজে বললুম, ‘কাল কোন্ পথে যাবেন?’
জবাব এলো : ‘যে কোন পথে- তবে আপনাকে কাল সাতটার-সকাল সাতটার আগে শিয়ালদ’ ইষ্টিশেনে হাজির হতে হবে।’
বর্ষাকালের পালক-ঝরা কাকের মতো আমার অবস্থা। আড়ষ্ট জিহ্বায় বললুম, তথাস্তু, (মনে মনে ঃ জয় হোক, মহারাজ)। ‘আজাদের’ সম্পাদক শামসুদ্দীন সাহেব ‘পরিস্থিতি’টা একটু জোলো করে দিলেন। চায়ের কাপে ঠোঁট ডুবাতে-ডুবাতে বল্লেন, ‘কাল আপনার হাজিরি চাই-ই।
মুজীবর রহমান খাঁ সাহেব-(চাদর দুলাইয়া, সহাস্যে) ‘না হলে পার্সেন্টজ পাবেন না।’
বাহার সাহেব তখনও সন্দিগ্ধ।জোরগলায় বললেন। পণ্ডিতমশায়ের ধমকের সুরটা অনেক দিন পরে কানের পর্দায় গুমরাতে লাগল।
পার্ল বাকের একটা উপন্যাস পড়ছিলুম রাত্রে। ভালো লাগছিল। ঘুমোবার সময় দেখি ঘড়ির কাঁটাদুটো বারোটার ঘরে। সকালে ওঠা আমার কোষ্ঠিতে লেখেনি। ভয় হল। আর মনে পড়তে লাগল…পণ্ডিতমশায়ের গলার আওয়াজটা। যা করে মালিক, লেপের তলায় সেধোঁলুম।
হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। শীতের দিন। আমার ঘরের জানালা দুটো বন্ধ। কিছু দেখার যো নেই। আলো জ্বেলে ঘড়ির দিকে চেয়ে চক্ষু চড়কাগাছ! কাঁটায় কাঁটায় ছ’টা তিরিশ। হাতে মাত্র আর আধ ঘন্টা। এই সময়ের মধ্যে মুখ-ধোওয়া, স্নান, শেভ, চা-খাওয়া, প্রসাধন ইত্যাদি। কতগুলো ছেঁটে দিতে হবে, নচেৎ উপায় নেই। শীতকাল, তাই স্নানের ঝক্কি পোহাতে মন রাজী নয়। মুখ-ধোওয়া, চা-খাওয়া আপাতত: স্থগিত থাক। (আয়নার সম্মুখে দাঁড়িয়ে) কিন্তু শেভ করা? কোন বিদেশ-যাত্রার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া চলে না। আধা-শেভ কোন রকমে সারলুম। ভালো ব্লেড ছিল না, আর দোকান যাওয়ার হাঙ্গামা ঘাড়ে এখন নেয় কে?


বাসা থেকে বেরিয়ে রিক্শা পাওয়া গেল। ঠুন্-ঠুন্-ঠুন্। চলো শিয়ালদ’। কলকাতায় কাক ডাকছে তখন। গ্যাসগুলো খানিক আগে নিভেছে।
মিনিট দশ পরে ষ্টেসনে পৌঁছলুম। তখন সাতটা বাজতে মাত্র সাত মিনিট বাকী।
মুক্তকচ্ছ হয়ে ছুটে গেলুম প্ল্যাটফর্মে। চেনা-শোনা কাউকে দেখলুম না! মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লাম। এত কষ্ট স্বীকার- তবু ভরা-ডুবি হল।
মনে হল ঃ কটায় ট্রেণ? তাঁরা ত চট্টগ্রাম ‘মেলে’র কথা বলাবলি করছিলেন। গার্ডকে জিজ্ঞেস করলুম, ‘চিটা-গাঙের মেল ছেড়ে গেছে?’
‘না, সে ত সাতটা বিশে।’
বুকটায় হাত দিয়ে দেখলুম। প্রাণ-বায়ু নতুন হয়ে ফিরে এসেছে।
‘তার আগে কোন ট্রেণ গেছে?’
‘সে রাত্রি পাঁচটায়।’ গার্ড চলে গেল।
ভরসা হল। কলকাতা তখন র্ফশা হলো। চারিদিকে রোদ উঠেছে।
প্লার্টফর্মে প্রাভাতিক ভ্রমণ শুরু হল।
‘কি, কেউ আসে নি?’-পেছনে কে যেন ডাকল। ফিরে দেখি, মুজীবুর রহমান খাঁ সাহেব।
তখন ঘড়িতে সাতটা বেজেছে।
‘না-দেখুন ত আমাকে সাতটার আগে থাকতে বলে-’কাঁচুমাচু মুখে হাসবার চেষ্টা করলুম।
‘তাই ত’। মুজীবর রহমান খাঁ সাহেব একটু সন্দিগ্ধ হলেন। পরে বললেন, ‘চলুন বাইরে গিয়ে দাঁড়াই, এখানে প্ল্যাটফর্মে লোকের ভিড়।’
সত্যি। জনতা ষ্টেশনের চত্বরে ক্রমশ: শুরু হতে লাগল।
শিয়ালদ’র এক কোণে দাঁড়িয়ে আমরা দুইজন। চেনাশোনা কেউ আসছে না। মনটা ভার-ভার।
আজ সকালে কার মুখ দেখে উঠেছিলুম। ঠিক করতে পারলাম না।
‘ঐ-আসছে।’ মুজীবর রহমান খঁf সাহেব আঙ্গুল বাড়ালেন। মাথার উপর একটা এরোপ্লেন গোঁ গোঁ শব্দে উড়ে যাচ্ছিল। ভয় হলো। কোন বিদেশী শত্রু না কি!
‘ওটা কি ইতালীয় জাহাজ মুজীবর রহমান সাহেব?’
‘কৈ?’
‘ঐ যে বললেন আসছে।’
তিনি হেসে উঠলেন : ‘এরোপ্লেন নয়-ঐযে-মি: লতীফ, আদাব-আদাব।’ সম্মুখে দেখি একজন অপরিচিত লোক। হাতে একটা কাগজ। পাজামা-আচকান-ফেজধারী।
মুজীবর রহমান সাহেব পরিচয় করিয়ে দিলেন। এঁকে দেখতে কতটা মিঃ হার্ডির মতো। নাতিদীর্ঘ, স্ফীতোদর অলিভার হার্ডির সব গুণগুলি এখানে খুঁজে পাবেন। কাঁদো-কাঁদো মুখটী অবিশ্যি তার মত নয়। কানের একদিকে ঘাড়ের ডান-কোণে সোজাসুজি একটু উপরে কোন চুল নেই। তবে টাক নয়। জায়গাটা ঢাকা দেওয়ার কী মুন্সীয়ানা! থোবাথোবা লম্বা চুল তার উপরে সাজানো। মাঝে মাঝে বন্ধ্যা চামড়াটা বেরিয়ে পড়ে। তখন উইঢিবি বলে ভুল হতে পারে।
‘ঐ যে-আর একজন।’
ইনি আমার চেনা লোক। দুদুমিঞা (ওবায়দুল্লা সাহেব) এঁকে দূর থেকে চেনা যায়। কারণ টাকে এর মাথা খেয়েছে। আমাদের দেশে টাকে ও টাকায় বড়লোকদের মাথা খায়- দুদুমিঞা সেদিক থেকে সৌভাগ্যবান। আমাদের হিংসা হয় বই কি। অনেক চীনেম্যান মাথার চারদিকে চুল কামিয়ে খানিকটা ফাঁক রাখে মাঝখানে। আমরা দুদুমিঞাকে ওয়াং-চুয়াং বলতে পারি।
মিঃ হার্ডি. ওয়াং-চুয়াং, আমি ও মুজীবুর রহমান খাঁ সাহেব ‘স্কোয়ার’ টেবল বৈঠকে। হঠাৎ মুজীবর রহমান খাঁ সাহেব চীৎকার করে উঠলেন, ‘ঐ আর একজন- আর একজন- শামসুদ্দীন সাহেব, জোবেদ আলী সাহেব, আবুল হোসেন, নাসির আলী সাহেব- ওয়াজেদ সাহেব-। একে একে অনেকেই এলেন। কিন্তু বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির সম্পাদকেরই দেখা নেই। ট্রেন ছাড়তে আর এক মিনিট বাকী।
দশ অনুপল-তিরিশ অনুপল-২৮ সেকেন্ড- সাড়ে ৫৯ সেকেন্ড-এক মিনিট। গার্ড হুইশেল দিলো। ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে গর্দভ ইঞ্জিনটা এগোতে লাগলো। সবাই চুপ্চাপ। মাঝি নেই। দাঁড়ীরা শেষে কি মাঝ-দরিয়ায় বানচাল হবে?
আরো পাঁচ মিনিট গেলো। মেওয়ার লোভে আর সবুর সয় না। কোথায় হবিবুল্লাহ সাহেব? সবায়ের মুখে ঐ এক কথার ফোড়ন।
ঐ আসছেন-। সবাই উৎসুক হোয়ে পথের দিকে তাকালাম।
দু’মিনিট পরে দু-টী লোককে ঘিরে ষ্টেশনে একটা ছোট খাটো ভিড়।
চতুর্দিক থেকে ফরিয়াদ আসে ঃ কেন এত দেরী, এই বুঝি সাতটা বাজছে ইত্যাদি।
বাহার সাহেব নির্বিকার! মৃদু হেসে বল্লেন ঃ ‘কোথায় দেরী হয়েছে? ঋতুরাজ ‘বাহার’ সবঋতুর শেষেই আসে। বাহার আজ চাটগাঁ যাবেন না, যাবেন হুগলি। হুগলির ট্রেণ ছাড়েনি এখনো। ঢের ট্রেণ আছে।’
কথাটা সত্যি। তিনি ঘড়ি দেখে বললেন, ‘আর চার মিনিট পরে হুগলির ট্রেণ, চলুন, শিগগীর।’
তথাস্তু। সবাই প্ল্যাটফর্মের গেটের দিকে ছুটে গেলুম। আর মাত্র চার মিনিট বাকী।
‘এখনো যে টিকেট করা হয়নি।’ কে একজন নেপথ্যে বললেন।
আমাদের সঙ্গে কবি মোজাম্মেল হক সাহেব আছেন, সে কথা ভুলেছিলুম। তাঁর মুখের দিকে তাকালুম। সাদা চাপ দাড়ীর জানালার ভেতর দিয়ে তাঁর ঠোঁটের মৃদুহাসি তখনো মিলিয়ে যায়নি।
গার্ডের হুইশেল বাজলো। আর দেরী করা চলে না। সবাই গেটের দিকে এগোই। ‘টিকেট প্লিজ।’ টিকেট-চেকার আমাদের পথ রোধ করল।
‘টিকেট কিনতে পারিনি মশায়। দেরী হয়ে গেছে।’
‘না, তা চলবে না, মশাই। টিকেট আনুন।’ চেকার বলল।
গাড়ী ছেড়ে দিলে।
একে অপরের মুখ চাওয়াচায়ি আর মৃদুহাস্য করা ছাড়া উপায় কী। আর এক ঘন্টা সতর মিনিট পরে ট্রেণ! এতক্ষণ কি করা যায়। এতগুলো বেকার পঙ্গপাল।
আগে টিকেট করা যাক্। তারপর অন্য কথা।
ধনুমামা ম্যানেজার। লোকগণনা আরম্ভ করলেন ঃ এক-দুই…আঠারো জন।
‘আপনার নিজেকে গুণেছেন?’
‘Oh, I see তাইত উনিশজন। তবে আমাকে গণবার দরকার নেই।’ ‘বিশ্বমামার’ মুখ থেকে খই ফুটতে লাগল।
টিকেট কিনতে গিয়ে এক বিপদ। মামাকে আমরা চৌকস তুখোড় লোক বলে জানি। তিনি এক ভুল করে বসলেন। টিকেট-সেলার লোক ভালো, তাই চাটার্ড একাউন্ট্যান্টকে ফোন করতে হল না। সে উনিশখানা টিকেটের বদলে কুড়িখানার দাম নিয়েছিল। মামার ধমকে ফিরে দিতে পথ পেলনা। মামা নিজের বাহাদুরীটা না নিয়ে ছাড়লো না ঃ ‘আমি ইচ্ছে করে কুড়িখানার দাম দিয়েছিলাম, দেখি ব্যাটা কী করে। না হলে- বেটাকে মামার বাড়ী পাঠামু না!’
হ-য়-র করে আধাঘন্টা গেলো। এখনো সাতচল্লিশ মিনিট বাকী ট্রেণ ছাড়তে।
সকালে তাড়াতাড়িতে কিছু খাওয়া হয়নি। এই ফাঁকে-মন্দ হয় না। কিন্তু একা একা, মনটা কেমন করতে লাগল।
বাহার সাহেবের প্রস্তাবে এই সময় আমার ভার নেমে গেল ঃ ‘চলুন কিছু ডানহাতের কাজ সেরে আসি।’
সবাই গিয়ে উঠলুম একটা ইসলামী হোটেলে- যেখানে চাপাতি আর নেহারী পাওয়া যায়।
সকলে খাওয়ায় মশগুল। ট্রেণের দিকে খেয়াল নেই। মাত্র সাত মিনিট বাকী, এমন সময় শামসুদ্দীন সাহেব চেঁচিয়ে বললেন,(হোটেলে যা হল্লা চলছিলো ভদ্রস্বরে কোন কথা বলা সেখানে ভদ্রতাবিরুদ্ধ) ‘জলদি ঘড়ির দিকে তাকান্।’
বাহার সাহেব তাঁর চাপাতিটা ঢোঁক গিলে গলার নিজে নামালেন, তার সাথে ঢক্ঢক্ করে একগ্লাস পানি। ‘আহ, বারোটা পর্যন্ত আর কিছু দরকার হবে না।’ তাঁর মন্তব্যটা বেরিয়ে এলো তখনই।
ষ্টেশনে এসে আবার বিপদ। আজ সকালে কার মুখ দেখে উঠেছিলুম!
লোকগণনা হচ্ছে ঃ এক-দুই…উনিশ। আর একজন কাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
আবুল হোসেন নেই- আবুল হোসেন নেই।
হায়, হোসেন। মহররমের চাঁদ এখনো অনেক দূরে। কোথা গেলেন তিনি? সবাই উদ্বিগ্ন। ট্রেণ ছাড়ে ছাড়ে- আর তিন মিনিট।
ষ্টেশনের সমস্ত জন- মুখের দিকে তাকাই।
আমাদের দলে ‘বাহার’ আছে। হারিয়ে যাওয়া লোকটিকে ‘নও-বাহার’ আখ্যা দিতে পারি। শীতের পর বসন্তে লাল টেপারী ফল আমদানী হয়। আবুল হোসেনের মুখভরা ব্রণ, দূর থেকে টেপারী মনে হবে, সেই অনুষঙ্গে বসন্তের কথা মনে পড়ে- অতএব ‘নও-বাহার’।
হায়, হোসেন!
মর্সিয়া-জারী করে আমরা ট্রেণে গিয়ে উঠলুম। একজন শুধু টিকেট হাতে রইলেন গেটে, যদি তাকে খুঁজে পাওয়া যায়।
গার্ডের শেষ হুইশেল বেজে গেল। দলের একদিক ভেঙে গেল। তাই একটু মুষড়ে পড়লাম। সঙ্গে ছিলেন তরুণ গায়ক আমাদের ফরীদ (মোর্শারাফ হোসেন)- তিনি গান শুরু করলেন।
ট্রেণ চলছে। খট্খট্ শব্দ। দুপাশে মিল-অঞ্চলের কর্ম-ব্যস্ততার অনুনাদ, ঘুমভাঙা হাইতোলা কুকুরের ডাক… তার সাথে অলস ভৈরবীর কান্না সমস্ত সকলটার ক্লিষ্ট আবহাওয়াকে মুছে দিতে লাগল।
রাত্রে ভালো ঘুম হয়নি। চোখের পাতাদুটো ক্রমে জড়িয়ে আসছে।
পান বিড়ি-গরম দুধ-বাবু কুলী- হঠাৎ নাড়া খেয়ে ঘুম ভেঙে গেল। চোখের পাতাদুটো তখনো খুলতে পারি নি। কি হোলো?
একজন আমাকে নাড়া দিয়ে বললেন, ‘নৈহাটী-চলুন।’
‘তাই নাকি?’ ধড়মড়িয়ে উঠে পড়লুম। মুখ-চোখ রুমালে মুছে ট্রেণের কামরা থেকে প্ল্যাটফর্মে নামতে হোলো।
আবার লোকগণনা শুরু। পাছে কেউ হারিয়ে যায়। এবার মজ্লিশ গরম। আবুল হোসেনকে দেখলুম। মহররম এখনও অনেক দূরে-ধারণাটা মিথ্যে নয়।
নৈহাটী থেকে ফেরীঘাট মিনিট সাতেকের পথ। ষ্টেশনের আড়াআড়ি নদীর ওপারে চুঁচুড়া-আমাদের গন্তব্য স্থল।
নৌকার উপর উঠে চুপ করে রইলুম। আমার সঙ্গীদের মুখে ফরসুৎ নেই। আমিই শুধু এক-ঘরে।
সকালের নদী, দু’পাশে তখনো মিলগুলো স্তব্ধ। জোয়ার ছিলোনা, ধারে ধারে দর্শনানার্থীর অভাব নেই। এই কর্দমাক্ত জলে পুণ্যসঞ্চয়ের কী লোভ! আবুল হোসেন সে লোভ সামলাতে পারলেন না। প্রথম প্রস্তাব এলো তাঁর দিক থেকে ঃ ‘এত পয়সা খরচ করে হুগলী যাচ্ছি গঙ্গাস্নানটাও সেরে যাই।’
যিনি উপদেষ্টা তিনিই শেষে পেছ-পা হলেন। পীর যখন বিমুখ, মুরীদানরা নিরুপায়। হাজার ঘুমের ভিড়েও আমার হাসি এলো।
আবার গান। নদী বুকে ভাটিয়ালী সুর বেশ জমে। শুধু মাথার উপরে চড়া রোদ্দুর সব মাটী করে দিলে।
মিনিট দশ পরে ঘাটে গিয়ে নৌকা থামল। একে একে ডাঙায় উঠলুম। আবার গোণা-গুণতি। হারাধনের দশটা ছেলে- সেই ছড়ার সুরে। নদী পার হতে কত ভয়। উনিশ জনই আছে, গণনা নির্ভুল। যাক বাঁচা গেল।
প্রাচীন বৈদিক শব্দ ক্রম-বিবর্তনে বাংলায় অনেক সরল রূপ ধারণ করেছে। বন্টন হয়েছে বাঁটা-সেই সুত্রে হাঁটার আসল রূপ ছিল হন্টন এ-ধারণা সঙ্গত (সুনীতিবাবু কি বলেন?)। ট্রেণ-নৌকা-আবার হন্টন। নদীর তীরে তীরে হন্টন।
বাউন্ডুলে জীবন শুরু হোয়েছে। আধঘন্টা চলছি শুধু। পিপাসা লাগছে, ঘাঁটী শিগগীর চাই। কিন্তু সেদিকে কারো নজর নেই। চলাটাই যেন ঐ মুহূর্ত্তের আনন্দ।
যাক, বাঁচা গেল। একটা আস্তানা পাওয়া গেল। কবি গোলাম মোস্তফা সাহেবের বাড়ী।
ঘরটার নাম “প্রভাতী।’’ ঐ নামে কত সুন্দর অনুষঙ্গ জাগা উচিত। তখন বেলা বারোটা- আমার কিন্তু চাপাতির কথা মনে পড়ল। ভারী খিদে লাগছে।
মেঘ না চাইতে জল। চাপাতির জায়গায় পেলাম- বিরিয়ানী, মিষ্টি দই, লেবু। এক বিয়ে-বাড়ীতে আমাদের আর্জ্জেন্ট-নেমন্তন্ন হোয়ে গেল। কোথায় হোটেলে পয়সা খরচ হত, বেশ ভূরিভোজন হল।
খাওয়ার পর ভাবলাম একটু বিশ্রাম করব। না, সে যো আর পাওয়া গেল না- বাস ভাড়া করা হয়েছে, আমাদের পান্ডুয়া যেতে হবে।
চুঁচুড়া থেকে পান্ডুয়া আঠারো মাইল। গ্র্যান্ডট্রাঙ্ক রোড ধরে সোজা উত্তরমুখে যেতে হয়। এই নয় ক্রোশ পথ বাসে খুব ভালো লাগে। গ্গ্র্যান্ডট্রাঙ্ক রোডের দুইপাশে গাছপালার নিবিড়তা, মাঝেমাঝে ক্ষুদ্র জনপদ, পল্লীজননীর অঙ্গশ্রী-ফসলের ব্যস্ততা, এবং চাষীজীবনের খন্ড খন্ড ছবি সত্যই আনন্দদায়ক।
পান্ডুয়ার পথে পড়ে সপ্তগ্রাম। লুপ্তশ্রী বাংলার এই পল্লীটির সাথে কত কাহিনী না জড়িত আছে!
সপ্তগ্রাম, রাজবলহাট ইত্যাদি কয়েকটী গাঁ অতিক্রম করবার পরই পান্ডুয়া।
এইখানে একদিন মুসলিম-বিজয়ের পতাকা ও ফকীর-দরবেশদের সাম্য-মন্ত্র একযোগে আকাশের নীলে নীড় বেঁধেছিল।
পান্ডুয়ার সে শ্রী আর নেই। চারিদিকে ঘন জঙ্গল, আগাছার বন। এই গাঁয়ে অনেক ‘মাজার’ আছে শোনা গেল।
আমরা শাহ্ সুফীর মাজার দেখতে গেলাম। মাজারটী প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। জায়গা-জায়গা অর্ধভগ্ন। একটী হলুদ রঙের কাপড়ের গেলাফে সুফী সাহেবের কবরটী ঢাকা। মাজারের দক্ষিণদিকের বারান্দায় একটী প্রস্তরখন্ড পড়ে রয়েছে। তার একদিকে আরবী হরফে কি যেন লেখা-অন্যদিকে ভগ্নমস্তক কয়েকটী দেবদেবীর মূর্ত্তি আঁকা।
সোজাসুজি হাতকুড়ি উত্তরে শাহ্ মখদুমের কবর। ইতি শাহ্ সুফীর ওস্তাদ ছিলেন। ঐ মাজারের সম্মুখে একটী মসজিদ। তার ভেতরে দেওয়ালে যে লতাপাতা আঁকা তা ঠিক অজন্তার গুহা-চিত্রের পদ্ধতির অনুরূপ।
স্থানটা খুব নির্জন। শুধু মসজিদের কক্ষাভ্যন্তরস্থ একটী ঘড়ির টিক্টিক্ শব্দ সে নির্জনতাকে আরো স্থবির করে তুলে। মধ্যযুগের আবহাওয়ায় আধুনিকতার এই লজ্জা-কুন্ঠ প্রবেশায়োজন-কেমন খাপছাড়া মনে হয়। জায়গাটীর চারিদিকে বকুল ও আমগাছের জনতা। মসজিদের পশ্চিমে একটা সানবাঁধা পুষ্করিণী। তার সিঁড়ির উপর আমাদের বসিয়ে নাসির আলি সাহেব একটা ‘ফটো’ নিলেন। একটা ঝাঁকড়া তেঁতুল গাছ এই স্থানের গাম্ভীর্য্যকে আরো দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
মাজার-প্রদর্শনের পর আমাদের মিনার-আরোহণ পর্ব। ঐ স্থানের ঠিক পূর্বে পঞ্চাশ গজ দূরে একটী উঁচু মিনার আছে। কলকাতার মনুমেন্টের প্রায় তিন-পঞ্চমাংশ। অনেকগুলি সিঁড়ি। উঠতে পা ধরে যায়। মিনারের বারান্দায় দাঁড়িয়ে দূরের গাঁগুলো অনেকক্ষণ চেয়ে চেয়ে দেখলুম। এখানে অনেক দেরী হল।
মিনারের উত্তরেও একটা পোড়ো জমির পাশে পুরাতন ইমারতের ধ্বংসাবশেষ। সেখানে ভাঙা স্তূপের ভেতর দিয়ে হেঁটে দেখলুম জায়গাটা। বড় ‘হল’ ছিল, বোধ হয় দরবার বসত।
এবার ফেরার পালা। মধ্যযুগের আবহাওয়া থেকে বেরিয়ে হাঁপ ছাড়লুম। বাসে আমার মন আবার হাল্কা। বন্ধুরা চারদিক থেকে হল্লা শুরু করেছেন। বাহার সাহেবের গলা সবার উপর টেক্কা-মারা। গল্পের রাজা। কথা আর ফুরায় না। এ কথা, সে কথা- রান্নাঘর থেকে রাজনীতি পর্যন্ত গড়াতে লাগল।
মি ঃ হার্ডি গল্প শুরু করলেন ঃ এক রাজার দুই ছেলে-একজন অন্ধ আর একজন চোখে কিছুই দেখে না।
‘চমৎকার-চমৎকার।’ সবাই হেসে উঠল।
তার গল্প আর এগোল না।
বাহার সাহেব-; না, তিনিও সুবিধা করতে পারলেন না। শেষে একদম নিঝ্ঝুমের পালা। শুধু বাসের গোঁয়ানি দু’পাশের তরুলতাকে কাঁপিয়ে দূরে দূরে ছড়িয়ে পড়ছিল। আমরা কতগুলি প্রাণী চুপচাপ। বাসের ভেতর ‘পিন-পতনের নীরবতা’।
হঠাৎ আবার সবাই হি-হি-হি করে হেসে উঠলো। কে একজন খামাখা হেসে উঠে প্রথমে, তার সাথে সাথে ঐ সংক্রমণ।
গল্প-গুজবে সময় বেশ যাচ্ছিল। আমাদের পেছনে একটা মটোর খুব জোরে হর্ণ দিতে দিতে শা শা এগিয়ে আসছিল।
‘যদি এখন ধপপরফবহঃ হয়?’ বাহার সাহেবের গলা শুনতে পেলুম।
শামসুদ্দীন সাহেব বললেন ঃ ‘এতগুলো সাহিত্যিকের একসাথে মৃত্যু- একটা রেকর্ড হবে পৃথিবীতে-ডড়ৎষফ ৎবপড়ৎফ.’
একজন ভেংচে কেঁদে উঠলো ঃ ‘হায় মুসলিম বাংলা, তোমার সাহিত্যিক আর নেই!’
সমস্ত বাসে হাসির ঢেউ খেলে গেল।
হুগলী পৌঁছুতে আমাদের প্রায় সন্ধ্যা। দিন তখন গাছের আগায়।
হাজী মোহাম্মদ মোহসেনের কবরস্থানে ঢুকলুম। পাশাপাশি কয়েকটা কবর-সমস্তই মোহসেন ও তাঁর আত্মীয়গণের। হুগলী নদীর পাড়ে এই সমাধিভূমিটী অতীব মনোরম। কবরগুলির অন্যান্য দিকে ছোট ছোট বাগান। নাসির সাহেব কতকগুলি ফটো নিলেন খুব আগ্রহ সহকারে।
দানবীর পুণ্যাত্মার প্রতি আমাদের হৃদয়ের সমস্ত শ্রদ্ধানিবেদন সমাপন করে বাইরে এলুম। তখন সন্ধ্যা প্রত্যাসন্ন।
আমাদের পরবর্তী গন্তব্যস্থল ইমামবাড়া। ইহা হাজী মোহ্সেনের দ্বিতীয়র্কীর্তি। মোগল স্থাপত্য-শিল্পের নির্দশন ইহার প্রাচীর-গাত্র। ফার্সী ভাষায় হাজী সাহেবের দানপত্র তাতে খোদাই করা। হুগলী নদীর তীরে ঐ সৌধটী পথিকের মন স্বতঃই আকর্ষণ করে। ইমামাবাড়ার ঝাড়-সুসজ্জিত কক্ষে মোহসেনের পুণ্যস্পর্শ যেন এখনো জীবিত।
ইমামবাড়া দেখা যখন শেষ হল, তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে।
হুগলী মোহসেন ইনষ্টিটিউটে মোহসেন স্মৃতি-বার্ষিকী হবে- সেখানে আমাদের যোগদান আশু কর্ত্তব্য। তাড়াতাড়ি বাসে উঠতে হোলো। কয়েক মিনিট পরে আমাদের গন্তব্যস্থলে পৌঁছলুম।
এখানে অনেক রাত্রি হোয়ে গেল। সভার সভাপতিত্ব করলেন মৌলবী মোজাম্মেল হক সাহেব।
রাত্রি নটার সময় আমরা হুগলী থেকে কলকাতার দিকে রওয়ানা হলুম।
নদী পার হতে প্রায় তিন কোয়ার্টার লেগে গেল। মিঃ ফরীদের গান এই সময় এত ভাল লেগেছিল! তার গলায় ভাটিয়ালী-গান এত চমৎকার খেলতে পারে- বিশ্বাস হচ্ছিল না। নদীর বুকে জুটমিল কারখানার আলো, হিম-নৈশ-স্তব্ধতা, দূরাগত জাহাজের হুইশেল, দাঁড়ের শব্দ- সব মিলে গানের এমন মোহময় আবেষ্টনী তৈরী করতে পারে- সেদিন উপলদ্ধি করেছিলুম।
নৈহাটী ষ্টেশনে যখন পৌঁছলুম তখন ঢং ঢং দশটা বাজল-কাছে কোন বড়লোকের বাড়ী আছে, মনে হলো তারাই প্রহর বাজাচ্ছে।
কলকাতা-অভিমুখী ট্রেণও হাতে-হাতে পাওয়া গেল।
সেই সকালের পুনরাবৃত্তি। পুরাতন ষ্টেশন, ফেরী-ওয়ালার হাঁক ইত্যাদি মুখস্থ কবিতার মত বমি করতে করতে গর্দ্দভ-ইঞ্জিনটা শিয়ালদ’ ষ্টেশনে পৌঁছুল।
সমস্ত শরীরে অবসন্নতা। ট্রেণ থেকে আর ঠান্ডায় নীচে নামতে ইচ্ছা হয় না। হবিবর রহমান তালুকদার সাহেব আমাদের চা খাওয়াবেন প্রতিশ্রুতি দিলেন।
আমজেদিয়া হোটেলে চা আর টোষ্ট খেয়ে যেন পুনর্জন্ম পেয়েছি মনে হলো।
তার পরই রিক্শায় চড়ে বাসার দিকে মুখ ফেরালুম।
ঘড়িতে তখন কাঁটায় কাঁটায় বারোটা।
#
মাসিক মোহাম্মদী / পৌষ, ১৩৪৭